আবরার হত্যা : খুনির লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি

আবরার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বুয়েট ছাত্রলীগের সমাজসেবাবিষয়ক উপসম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল তার স্বীকারোক্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

ইফতি আদালতকে বলেছে, আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প আর স্কিপিং রোপ (প্লাস্টিকে মোড়ানো মোটা রশি) দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা দফায় দফায় পিটায় আবরারকে। এর মধ্যে কয়েক দফায় আবরার বমি করেছে। আর অচেতন হয়ে পড়েছে কয়েকবার। এরপরও নির্যাতন থেকে রেহাই মেলেনি তার।

ইফতি ওরফে সকাল তার স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেছে, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে ‘আবরার শিবির করে, তাকে ধরতে হবে’ বলে মেসেজ দেয়। এরপর মেসেঞ্জার গ্রুপে সাড়া দেয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা। আবরার তখন বাড়িতে থাকায় সে ইফতিকে বলে, ‘ওকে বাড়ি থেকে ফিরতে দেন।’

স্বীকারোক্তিতে ইফতি জানায়, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার কিছু পর আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। আবরারের দু’টি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও সাথে আনা হয়। বুয়েট ছাত্রলীগের উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ একটি মোবাইল ফোন এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তানভীর আরেকটি মোবাইল ফোন চেক করে। একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মুনতাসির আল জেমি আবরারের কাছ থেকে তার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড নিয়ে খুলে চেক করে। জবানবন্দীতে উল্লেখ করা হয়, আবরারের মোবাইল আর ল্যাপটপ চেক করার সময় মেহেদী হাসান এবং বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মো: মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন কক্ষে আসে। মেহেদী তাদের বুয়েটে কারা কারা শিবির করে তা আবরারের কাছ থেকে বের করার জন্য নির্দেশ দেয়। এ সময় মেহেদী বেশ কয়েকটি চড় মারে আবরারকে।

অন্য রুম থেকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প ও স্কিপিং রোপ আনা হয় আবরারকে মারার জন্য। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত স্টাম্প এনে ইফতির হাতে দেয়। ইফতি তা দিয়ে আবরারকে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। কয়েকটি আঘাত করার পর স্ট্যাম্প ভেঙে যায়। এরপর অনিক সরকার তার ওপর আক্রমণ শুরু করে। শরীরের বিভিন্ন অংশে একের পর এক আঘাত করতে থাকে অনিক সরকার। এতে দিকভ্রান্ত হয়ে আবরার এলোপাতাড়ি কিছু নাম বলতে থাকে। ছাত্রলীগ নেতা মেফতাহুল আবরারকে চড় মারে এবং স্টাম্প দিয়ে হাঁটুতে পেটাতে থাকে। মেহেদী তখন মোবাইলে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেলের সাথে যোগাযোগ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইফতি ক্যান্টিনে খেতে যায়। মিনিট বিশেক পর ফিরে এসে দেখে আবরার অচেতন হয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। তখন সে আবরারকে ধমক দিয়ে উঠে দাঁড় করায় এবং কয়েকটি চড় মারে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান তখন কক্ষে থাকা স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরারকে মারে। ইফতি আবার স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু ও পায়ে আঘাত করে। তানভিরও চড়-থাপ্পড় মারে।

রাত ১১টার দিকে অনিক সরকার আবার কক্ষে আসে। হঠাৎ অনিক স্টাম্প দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আবরারকে একের পর এক আঘাত শুরু করে। এভাবে টানা এক ঘণ্টা আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে অনিক সরকার। আবরার তখন অচেতন হয়ে পড়েছিল। উহ আহ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। অনিকের অবস্থা থেকে সেখানে উপস্থিত সবাই ভয় পেয়ে যায়। ১২টার দিকে অনিক চলে যায়। ইফতি জানায়, তারা বুঝতে পেরেছিল আবরারের তখন শ^াসকষ্ট হচ্ছে। মোবাইলে বিষয়টি অনিককে জানালে অনিক নির্দেশ দেয় আবরারকে গোসল করিয়ে দিতে এবং হাতে-পায়ে মলম মেখে দিতে। গোসল করানোর জন্য ইফতি কাপড় চোপড়ও নিয়ে এসেছিল। মেহেদী তখন আবরারকে দেখে বলে, ‘ও নাটক করছে’। আবরার তখন থেমে থেমে বমি করছিল। এ সময় তাকে নিয়ে ২০০৫ নম্বর কক্ষে শুইয়ে দেয়া হয়। অমিত তখন মেসেজ পাঠিয়ে পরিস্থিতি জানতে চায়। আরো মেরে তথ্য বের করার নির্দেশ দেয় অমিত সাহা। আবরারের অবস্থা খুবই খারাপ জানালে অমিত তাকে হল থেকে বের করে দিতে বলে। 

এর কিছুক্ষণ পর মেহেদী ও অনিক ২০০৫ নম্বর কক্ষে আসে। আবরারকে দেখে তারা বলেন, ‘ও ঠিক আছে।’ এরপর তারা চলে যায়। তখনো আবরার বমি করে যাচ্ছিল। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেয়ার জন্য নিচে নামাতে বলে। ১৭ ব্যাচের ছেলেরা আবরারকে নিচে নামানোর চেষ্টা করে। ব্যর্থ হলে তোশকসহ আবরারকে ধরে সিঁড়িতে নামিয়ে রাখে। তখন সাধারণ সম্পাদক রাসেল নিচে নেমে হলের প্রধান ফটকে পুলিশের সাথে কথা বলছিল। এ সময় মুনতাসির দৌঁড়ে এসে বলে, আবরারের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ইফতি তাকে মালিশ করতে বলে। ইসমাইল ও মনির তখন অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দেন। অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় তামিম বাইক নিয়ে বুয়েট মেডিক্যালের চিকিৎসক নিয়ে আসে। চিকিৎসক আসার পরপরই অ্যাম্বুলেন্স আসে। চিকিৎসক সিঁড়িতে আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও মারা গেছে।’ পরে ইফতি একটি কক্ষে গিয়ে শুয়ে থাকে। সেখান থেকে পরদিন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।