ইসরাইলি দখলদারিত্বের ভীত নাড়িয়ে দেওয়া আহেদ তামিমি’র গল্প

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতীক: আহেদ তামিমি। ছবি: সংগৃহীত

১৭ বছর বয়সী আহেদ তামিমি গত ডিসেম্বরে ইসরাইলি সেনাদের থাপ্পর মারার ঘটনায় ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের আইকনে পরিণত হয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘আমি কোন আর সাধারণ কোন কিশোরী নই। আমি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতীক। জেলের ভিতর জীবন ছিল কঠিন।’ ফিলিস্তিনি কিশোরী আহেদ তামিমি ভগ ম্যাগাজিনে একটা বিশেষ চিঠি লিখেছেন যেখানে তিনি ইসরাইলি দখলদারিত্বে পশ্চিম তীরে তার জীবনের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা লিখেছেন। এই চিঠিতি তামিমি তার বিতর্কিত গ্রেফতার এবং ফিলিস্তিনি প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠার কাহিনী লেখেন।

২০০১ সালের ৩১ জানুয়ারি পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরের নবী সালেহ এলাকায় জন্ম আহেদ তামিমির। তার বাবা, মা ও ভাইয়েরা অনেক বার আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন ইসরাইলি বাহিনীর হাতে। তামিমির চাচা রুশদি আল তামিমি ২০১২ সালে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার ফুফু বাসিমা আল তামিমি ১৯৯৩ সালে ইসরাইলি পুলিশের পিটুনিতে নিহত হয়েছে।

তামিমি লিখেছেন, ‘ইসরাইলি দখলদারিত্বে আমার বেড়ে ওঠা। শৈশব স্মৃতি বলতে ২০০৪ সালে বাবার গ্রেফতার হওয়া এবং তাকে জেলে দেখতে যাওয়ার কথাই আমার মনে আছে। ওই সময় আমার বয়স মাত্র তিন বছর। গতবছর আমার বয়স ছিল ষোল। রাতে পুলিশেরা হঠাৎ আমাদের এখানে তল্লাশি চালায়। সে’সময় আমাদের উঠোনে দাঁড়ানো একজন সেনাকে থাপ্পড় দে’য়ার জন্য আমাকে গ্রেফতার করা হয়। ৮ মাসের সাজা হয়। ইসরাইলি একটা জেলখানায় আমায় থাকতে হয়েছে।

ইসরাইলের ছায়ায় বড় হয়েছে তামিমি। বুঝতে শেখার পর থেকেই পরিবারকে দেখেছে ইসরাইলি আগ্রসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন করতে। তামিমি আক্ষেপ ক’রে বলেন:

[su_quote]‘আমি ১৭ বছরের সাধারণ একটা মেয়ে হতে চাই।’[/su_quote]

আমি সাধারণ কোন কিশোরী নই। আমার বাবা-মা দু’জনেই জেলে গেছেন, আমার মতোই। আর এখন আমার বড় ভাই ওয়াইদও জেলে আছে।’

তামিমি স্বীকার করেন যদি তিনি অন্য কোন দেশে জন্মগ্রহণ করতেন, যদি তাকে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে না হতো তাহলে তিনি খেলোয়াড় হতেন। ‘আমি একজন ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি সময়ের অভাবে খেলতে পারি না। আমাকে শৈশব ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদেই শেষ হয়ে গেছে।’ 

তামিমি ফিলিস্তিনি আন্দোলনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে বলেন, ‘সেই সেনাদের সমালোচনা কেন করেন না, যারা শিশুদের বন্দুক দেখায়? দোষারোপ করতে হলে আমাদের নয়, এই ইসরাইলি দখলদারিত্বের করা উচিত।’

আহেদ তামিমি। ছবি: সংগৃহীত

তার কারাবাস প্রসঙ্গে বলেন, ‘জেলের ভিতর জীবন ছিল খুব কঠিন। অন্যান্য মেয়েদের নিয়ে আমি পড়াশুনা করার চেষ্টা করতাম কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ এটাকে সাপোর্ট করতো না। তারা ক্লাস ভেঙে দিত। তারপরও আমরা বই পড়েছি। কারাগার থেকেই আমি ফাইনাল পরীক্ষা দিই। আমার সাথে শুধু আমার পরিবার দেখা করতে পারতো তাও দু’মাস অন্তর মাত্র ৪৫ মিনিটের জন্য।’

কারাগারে তামিমি’র মতো এমনও মেয়ে আছে যাদের গল্প কেউ জানে না। তামিমি স্বীকার করে, ‘সে এই দখলদারিত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইসরাইলি শোষণ নির্যাতন নিয়ে কথা বলার মুখোপাত্র হয়ে উঠেছেন। এ দায়িত্বের ভার বহন করা খুব সহজ কিছু নয়।’

‘আমার পাঁচ বছরের সাজা স্থগিত করা আছে। যদি আমি এমন কিছু করি, যা তারা অপছন্দ করে তাহলে আমাকে আবার ৮ মাস জেল খাটতে হবে। আমাকে খুব সাবধানে কাজ করতে হবে।’ তামিমি আরো বলেন।

‘মানুষ প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই নির্যাতনের বিরোধিতা করার সাহস আমি কোথা থেকে পাই। অথচ আমি এমন এক অবস্থান থেকে উঠে এসেছি যেখানে আমার চারপাশ আমাকে এসব করতে বাধ্য করেছে।’ এছাড়া নিজের বাবা-মাকে তামিমি তার সবচে’ বড় অনুপ্রেরণা মনে করেন।

বাবা-মা’র সাথে আহেদ তামিমি। ছবি: RANEEN SAWAFTA/ REUTERS

ফিলিস্তিনি কিশোরী অনুতাপ ক’রে বলেন, অবস্থা উন্নতির কোন ছাপ দেখতে পারছি না। উলটো এই উপনিবেশ আরো দীর্ঘায়িত হবে। পশ্চিম তীরে আগে যে ক’টা চেকপয়েন্ট ছিল, তার সংখ্যাও বেড়ে যাবে। তথাপি আমরা আশাকরি একদিন আমরা বসবাসের জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন পাবো।

কিন্তু এ সত্ত্বেও,  তামিমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছু স্বপ্ন ও সাধের কথা বলেন। ‘এখন আমি হাইস্কুল শেষ করেছি। আমি আইন নিয়ে পড়াশুনা কিরতে চাই যদিও জানি না আমি কীভাবে করবো। আমি আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে চাই, প্যালেস্টাইনের হয়ে ওকালতি করতে চাই।’

তামিমি এছাড়াও উল্লেখ করে যদি ইসরাইলের দখলদারিত্ব না থাকত তাহলে তার জীবন কেমন হতো। এ কিশোরী লেখেন, যদি সে তেমন কোন জীবন পেত, তাহলে সে অ্যাকরিতে চলে যেত।

[su_quote]‘সমুদ্রের কাছাকাছি থাকতাম। সাঁতার কাটতাম। আমি মাত্র একবারই সমুদ্রে গেছি যদিও আমার বাড়ি থেকে সমুদ্র মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে।’[/su_quote]

সাম্প্রতিক সময়ে তামিমি তার পরিবারের সাথে স্পেনে আছেন। সেখানে রিয়েল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব তাকে সম্মান জানায়। তার নাম লেখা জার্সি উপহার দেয়। সে তিউনিসিয়া ভ্রমণেও গিয়েছিল। তিউনিসিয়ান রাষ্ট্রপতির সাথে তার সাক্ষাৎ হয়।

উল্লেখ্য, দু’বছর আগে তামিমিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টার সময় সে ইসরায়েলি সৈন্যের হাত কামড়ে দেয়। তারও আগে ২০১২ সালে ইসরায়েলি সৈন্যদের সাহসের সাথে মোকাবেলার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইপ এরদোয়ান তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। আহেদ তামিমির বয়স তখন ছিল মাত্র ১১ বছর।

সূত্র: haaretz