১০৭ বছর বয়সেও দারুণ প্রাণবন্ত ম্যানচিনেল্লি’র জীবন রহস্য

ম্যানচিনেল্লি প্রতিদিনিকার মতো সেলুনের টাওয়েলটা ঝাড়লেন। পরের কাস্টমারকে বসতে দিলেন। চেরি হেয়ার স্যালুনটাতে দারুণ সব স্টাইলে চুল কাটা হয়। নিউইয়র্ক থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ। শংকর প্রজাতির সরু একটা মলের ভিতরে সেলুনটা।
“হেই পাইসান, ঠিক আগের মতই আছো!’  জন ও’রুখ, ম্যানচিনেল্লিকে ডেকে বললেন। ম্যানচিনেল্লি ততক্ষণে শক্ত হাতে কাঁচি ধরে জনের চুলের লেয়ার ঠিক করা শুরু করে দিয়েছেন। ছাপ্পান্ন বছর বয়সি কর্নেল ও’রুখ বলেন, “আমি কখনই কাউকে আমার চুল ধরতে দেই নাই। মি. ম্যানচিনেল্লিই এক শতাব্দী ধরে আমার চুল কাঁটছেন।
ও’রুখ, আসলে মি. ম্যানচিনেল্লি’র থেকে বছর তিনেকের ছোট। ম্যানচিনেল্লি এখন বয়স ১০৭ এবং এখনও ফুল টাইম কাজ করেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন দুপুর থেকে রাত অবধি কাজ করেন। তাঁর বয়স যখন এগার তখন থেকেই সেলুনে কাজ শুরু করেন। এটা ঠিক সেই সময়, যখন ওয়ারেন হার্ডিং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ।
২০০৭ এ যখন তাঁর ছিয়ান্নব্বই বছর বয়স তিনি সবচেয়ে বয়স্ক কর্মরত বারবার/নাপিত হিসেবে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেন।তখন থেকেই স্বীকৃতি আসতে থাকে। স্থানীয় জনসাধারণ, নির্বাচিত কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বারবার কোম্পানি ম্যানচিনেল্লিকে অভিনন্দন জানাতে থাকে। ১০০, ১০১, ১০২ বছর এভাবে চলতেই থাকে। মি. ম্যানচিনেলি একের পর এক এওয়ার্ড পেতেই থাকেন।
মি. ম্যানচিনেল্লির মজবুত শরীর, স্থির হাত এবং মাথা ভর্তি তুষার সাদা চুলের অধিকারী। তিনি সারাদিন একজোড়া পুরোনো কালো লেদারের জুতো পরে হাটাহাটি করেন।
“মানুষজন উনার বয়স দেখে পালিয়ে যেত সেলুন থেকে ।” সেলুনের মালিক জেইন ডিনজজা বলেন।
[su_quote]তিনি কখনো অসুস্থতার ছুটি নেননি। বরং অন্যান্য তরুণ কর্মীদেরও হাঁটু এবং পিঠের ব্যথার সমস্যা হয় কিন্তু তিনি একই রকম। তিনি একজন ২০ বছরের তরুণের চেয়েও বেশি মানুষের চুল কাটতে পারেন। অন্যরা যখন বসে বসে ফোন সার্ফিং করেন তিনি তখনও কাজ করেই যান।[/su_quote]
তাঁর এই দীর্ঘ জীবনের রহস্য কী জানতে চাওয়া হলে মি. ম্যানচিনেল্লি শুধুমাত্র সারাদিনের কাজের পরিতৃপ্তিকে উল্লেখ করেন। আর বলেন, তিনি কখনো অতিরিক্ত ধুমপান বা মদ্যপান করেননি। বংশগতভাবে তিনি দীর্ঘায়ু পাননি। তিনি তেমন নিয়মিত ব্যায়ামও করেননি। তিনি খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। পাতলা স্প্যাগেটি খাওয়ার কারনে তাঁর ওজন নিয়ন্ত্রিত ছিল। এখন পর্যন্ত তাঁর সবগুলো দাঁত রয়েছে এবং তাঁর নিয়মিত কোন ওষুধ খেতে হয় না। চোখে চশমা লাগেনি কখনও তাঁর। সর্বোপরি তাঁর চুলসজ্জ্বার হাতগুলো এখনো সচল এবং অবিচল।
[su_quote]আমি ডাক্তারের কাছে যাই, কারণ সবাই যেতে বলে; কিন্তু আমি এর কোন কারণ খুঁজে পাই না। আমি ডাক্তারকে বলি, আমার কোন ব্যথা নেই, কষ্ট নেই, কোন আঘাতও নেই।[/su_quote]
তিনি সারাক্ষণ কাজ করে গেছেন, কারণ এটা তাঁকে ব্যস্ত থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর। চৌদ্দ বছর আগে তাঁর সত্তর বছর বয়সি স্ত্রী, ক্যামেলিয়া মারা যান। তিনি প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে স্ত্রীর কবরে যান। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও ম্যানচিনেল্লি’র দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির এক বিশেষ কারণ।
মি. ম্যানচিনেল্লি নিউ উইন্ডসরে তাঁর কর্মস্থলের কাছাকাছি একাকী বাস করেন। তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে কাজে যান, নিজের খাবার নিজে তৈরি করেন, অবসরে  টেলিভিশন দেখেন। তিনি একজন প্রো-রেসলিংয়ের বড় ফ্যান। তিনি অতিমাত্রায় আত্মনির্ভরশীল। এখনো নিজের উঠোনের গাছ নিজেই ছেঁটে রাখেন।
তাঁর ছেলে বব ম্যানচিনেল্লি বলেন, “তিনি এমনকি কাউকে তাঁর নিজের চুলের ক্লিপিংসগুলোও এগিয়ে দিতে দেন না।” তিনি নিজেই তাঁর ৮৪ বছর বয়সি ছেলের চুল কেঁটে দেন। মিসেস ডিনেজজা, তাঁর স্যালুনের মালিক বলেন, “তিনি নিজেই নিজের দরকারি জিনিস কেনেন, নিজেই নিজের কাপড় লন্ড্রি করেন, নিজের বিল নিজেই পরিশোধ করেন; এটা পাগলামি। কিন্তু  তিনি মানসিকভাবে একদম সুস্থ আছেন।
তিনি আরো বলেন, “আপনি চারপাশে মানুষকে হামেশাই প্রশ্ন করতে দেখবেন, ‘কোন ওষুধ আমার খাওয়া দরকার, কোন খাবার খাওয়া দরকার, কোন এন্টি এইজিং ক্রিম ব্যবহার করা দরকার? ‘কিন্তু তিনি এসবের কিছুই করেননি।”
সময়ের সাথে সাথে চুলের ফ্যাশন পাল্টালে ম্যানচিনেল্লি নিজেকে সেভাবেই তৈরি করেন। তিনি বলেন, “আমি সব ধরনের চুলের কাট দিতে পারি। লম্বা কিংবা ছোট অথবা যেকোন স্টাইল… শ্যাগ কিংবা বুস্টার ব্রাউন, সোজা ব্যাঙ্গস বা স্থায়ীভাবে সোজা চুল, সবই করি।”
চুল কাটতে ব্যস্ত ১০৭ বছরের তরুণ মি. ম্যানকিনেল্লি। ছবিসূত্র : The New York Times
কিছু কিছু কাস্টমার প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কাছে চুল কাঁটতে আসেন। মি. ম্যানকিনেল্লি বলেন, “আমার কিছু খদ্দের আছে যারা চার প্রজন্ম ধরে আমার কাছে চুল কাঁটে। তাদের পিতা, পিতামহ, প্রোপিতামহ সবাই।
তাঁর ছেলে বব ম্যানচিনেল্লি বলেন, “তিনি তাঁর পুরোনো কিছু কাস্টমারকে চেয়ারে বসতে সাহায্য করেন। তিনি তাঁর ৮০ বছর বয়সি কাস্টমারকে বলেন, ‘যখন তুমি আমার বয়সে আসবে… ‘তাঁরা খুশী হন এটা শুনে।”
জেন স্যালিভান, একজন হেয়ার স্টাইলিশ, যিনি তাঁর পাশের চেয়ারে কাজ করেন, বলেন, “এটা সত্যি খুব অদ্ভুত যে তিনি একজন ফুল টাইমার হিসেবে কাজ করেন। এখানে সবাই সপ্তাহ শেষের দিনটির জন্য পাগল হয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সবাই ক্লান্ত হয়ে যায় কিন্তু তিনি কাজ করেই যান।
মি. ম্যানচিনেল্লি বলেন, তিনি ইতালির নেপলসে ১৯১১ এ জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে পরিবারের সাথে নিউইয়র্কের নিউবার্গে চলে যান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আট। তাঁর আরো সাতজন ভাইবোন ছিল। যার মধ্যে তিনি একাই বেঁচে আছেন। তিনি ১১ বছর বয়সে একটি স্যালুনে কাজ করতে যান। ১২ বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে পুরোপুরি কাজে যোগ দেন। তিনি আগের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন,  [su_quote]তখন চুল কাটাতে মাত্র ২৫ সেন্ট লাগতো। এখন তা ১৯ ডলার। তিনি তাঁর স্যালুনের ড্রয়ারে একজোড়া গতানুগতিক চুলের ক্লিপার রেখেছেন। সেগুলো তিনি ইলেকট্রিক ক্লিপার আসার আগে ব্যবহার করতেন।[/su_quote]
ম্যানচিনেল্লিকে  নিউ উইন্ডসর মেমোরিয়াল ডের প্যারেডের জন্য সবসময় পছন্দের শীর্ষ  তালিকায় রাখা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন নিবেদিত আর্মি মি. ম্যানচিনেল্লি ৭৫ বছর ধরে স্থানীয় আমেরিকান লিজিয়ন পোস্টের একজন গর্বিত সদস্য। যেখানে তিনি হুইস্কি খেতে পছন্দ করেন। মি. ম্যানচিনেল্লি র জন্মদিনে তাঁর সম্মানে স্যালুন বন্ধ থাকে এবং পার্টির আয়োজন করা হয়। সেই পার্টিতে স্থানীয় সুপারমল তাঁর সম্মানে খাবার সরবরাহ করে। মাঝেমধ্যে এই শতবর্ষীর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খোঁজ নেয়া ছাড়া প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর কোন ব্যতিক্রম নেই।
১০৭ বছর বয়সে ম্যানচিনেল্লি এখনো যেকোন তরুণের মত ফুল টাইমার হিসেবে পূর্ণ উদ্যোমে কাজ করে যান। তাঁর কর্মব্যস্ত জীবন, আত্মনির্ভরশীলতা, আনন্দবোধ, পরিমিত খাদ্যাভাস এবং সর্বোপরি জীবনের প্রতি পরিতৃপ্তি তাঁকে এক দীর্ঘ জীবন দান করেছে। 
তথ্য সূত্র : দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস