রিনা রাণী দাসের কবিতা: পাসপোর্ট

পাস‌পোর্ট


 

সীমানা!

তার কত প‌রিচয়, কত ভাগ, রকম-সকম!

 

বা‌ড়ির সীমানা! খে‌তের সীমানা! রাষ্ট্র-সীমানা!

ভাষা ভি‌ত্তিক সীমানা পাহাড়!

সীমানার তা‌নে নিজস্ব রাগ, তাল-লয়-সুর…

‌দ্যোতনা ছড়ায়। কিন্তু ম‌-নে-র?

 

ম‌নের সীমানা___

কখনও কখনও প্রাচী‌রের ম‌তো বেঁ‌ধে রা‌খে চোখ।

আবার কখনও চোখ যায় খু‌লে…‌

ডি‌ঙি‌য়ে পাহাড়, মালভূ‌মি-‌টিলা, বন-জঙ্গল

সমুদ্র-নদী, সমতলভূ‌মি ছে‌ড়েই নি‌জের উ‌ঠো‌নে।

 

রূপ-অপরূপ রূ‌পের মাধুরী টোলপড়া গ্রাম মা‌ঝে___

মধ্য সিঁ‌থি‌তে পাপ‌ড়ি ঠোঁ‌টের ন্যায় ছোট খাল,

‌তিল‌কের ম‌তো ছোট ঘর-বা‌ড়ি

‌ভেজা তু‌লো মেঘ, যেন কাশবন…

তার পিঠ জু‌ড়ে সুনীল আকাশ; রঙধনু র‌ঙে

কৃষক-নারীর কল-কাক‌লি‌তে মুখর সকাল।

‌গোধূ‌লি সন্ধ্যা, আজান-ঘণ্টা

কানা‌ড়ি সু‌রের দোয়া ও ম‌ন্ত্রে

চাঁ‌দের জ্যোস্না ঢ‌লে ঢ‌লে প‌ড়ে উ‌ঠোন-‌রোয়া‌কে, 

‌সেখা‌নেই আজও উত্তম কাকা নি‌জে‌কে খোঁ‌জেন।

 

পাল‌কের শোকে___

ছো‌টে অ‌বিরত… অতী‌তের মধু স্মৃ‌তির স্ব‌প্নে!

‌ছোট পাড়া-গাঁ‌য়ে কাঁদা মাখামা‌খি 

জীব‌নের লিটমা‌সে একা খোঁ‌জে; আর শুধু ভা‌বে___

 

পা‌খি য‌দি হ‌তো___

ডানা ঝাপ‌টি‌য়ে কাঁটাতার ফে‌লে দু’পা‌রে অবাধ

মুক্ত আকাশে ও‌ড়ে চ‌লে যেত,

আর সবু‌জের শ্বাস-প্রশ্বা‌সে রূপ-রস পেতে 

জন্মভূমির মা‌টি‌-নিশ্বাস নি‌তো। তারপর…

 

র‌হিম শে‌খের___

সা‌থে মারামা‌রি, অ‌ভিমান ভু‌লে…

‘আ‌লেয়া’র আ‌লো, নি‌য়ে হাসাহা‌সি, সে কী পাগলামী! সবই আবার নূতন মোড়‌কে 

পুকু‌রের পাড় ধ‌রে হেঁটে যা‌বে…শৈশবকা‌লে।

 

কীরে…র‌ হি ম!___

ম‌নে আ‌ছে তোর? ম‌হিশূর বটতলার মেলায়

‘আ‌লেয়া’ হারা‌লো! 

সে কত কান্না! কেন যে কেঁ‌দে‌ছি…

পাজ‌রে র‌য়ে‌ছে এখনও অব‌ধি, তা‌কেও একট‌ু ডে‌কো।

 

‌গুবাক তরুর কোঠ‌রে থাকত টি‌য়ের ছানারা, 

মাছরাঙা, কাঠঠোকরা পা‌খির সঙ্গ নিতাম — 

ম‌নে আ‌ছে তোর? 

সে কোঠ‌রে সাপ মা‌ঝে মা‌ঝে ছানা ধর‌তে আস‌ত। ছানা‌কে বাঁচা‌তে সা‌পের কামড়… 

‌খে‌লে সে ক‌ষ্টে, তুইও কষ্ট পে‌তি… ম‌নে আ‌ছে?

 

ই‌চিং বি‌চিং, এক্কা দোক্কা, চারা খেলা, আর 

বউ‌চি খেলায় ‘আ‌লেয়া’কে নি‌য়ে হ‌তো কত কাটাকা‌টি! 

ও‌পেন টু বাই‌স্কোপ, কুতকুত

টোপাভা‌তি, আর কানামা‌ছি ভোঁ ভোঁ, কত‌ যে খে‌লে‌ছি। 

ম‌নে আ‌ছে আ‌লেয়া’র? 

পুতুল খেলায় বর না করা‌তে ডাংগু‌লি মে‌রে 

‘আ‌লেয়া’র খুন ঝ‌রি‌য়ে‌ছি। আরও কত যে কী!

 

দুজ‌নের বা‌ড়ি ছিল পাশাপা‌শি, 

সকাল না হ‌তে ছু‌টে চ‌লে যে‌তে আ‌লেয়া’র বা‌ড়ি, 

সে কী রাগ হ‌তো…

আজও হা‌সি ম‌নে, এপা‌রে‌তে ব‌সে।

 

এক‌দিন তোর শিশুর পোষাক খু‌লে দিলি ডুব,

‌কি কার‌ণে জা‌নি উঠ‌লি না ভে‌সে…

‘আ‌লেয়া’ লা‌ফি‌য়ে বাঁচা‌লো তোকেই। 

ভে‌বে দুখ পাই, ধর্ম আলাদা করে যে আমায়।

 

ধর্মের যাঁতাক‌লে দুইভাগ! 

একভাগ পা‌নি, একভাগ জল, এ কেমন বি‌ধি? 

জ‌ল নিলো পিছু, 

র‌য়ে গেল পা‌নি, হারালাম বা‌টি। 

র‌য়ে গেল নাড়ী! 

তার টান আজও ছা‌ড়ি‌তে না পা‌রি, 

নিজ দে‌শে থে‌কে ম‌নে পরবা‌সী।

 

হায়! দেশ! দ্বেষ!

মাত্র মাইল দু‌য়েক প‌রেই জন্মভূ‌মির ঠিকানা!

বহু বৎসর ধ‌রে শুধু ভা‌বি…

এই দু’মাইল কত দূর…দূর! “‌দিল্লী বহুত দূর”?

 

কাঁটাতার বেড়া___

দুরুত্বটা‌কে বা‌ড়ি‌য়ে দি‌য়ে‌ছে…

পড়শী তো নয় যেন, দূর পরবাসী।

বু‌কের গভীরে জন্মভূ‌মির মান‌চিত্রের ছ‌বি।

 

পাস‌পোর্ট ছাড়া___

যে‌তে না দি‌লেও, মৃত্যুর প‌রে… 

চিতার বাসর সেখা‌নে ক‌রিও ও‌হে সূধীজন! 

য‌দিও তোমরা…বল‌বে আ‌মায়___‌দেশ‌দ্রোহী।

 

উত্তম কাকা___ 

ঘুম থে‌কে জে‌গে ম‌নে ম‌নে ভা‌বে 

এ কোন্ স্বপন!

দেশ প্রে‌মি‌কের লাই‌সেন্স কী শুধু পাস‌পোর্ট?

 

‌ও…র‌হিম শে‌খ___

‘আ‌লেয়া’রে খবরখান জানাই রাইখ্খ…

বকুল তলায় আ‌লেয়া’র ল‌গে খেলামু,

জন্ম ‌ভিডাটা আ‌গের মতন রাইখ্খ…

আ‌মি আইতা‌ছি, ওহা‌নে পি‌দিম জালামু।

 

পাস‌পোর্টডা‌রে পুইড়্ড়াই দিমু। 

মনডায় জ্বালা, এক মুড মা‌ডি দিবা? 

অ‌ঙ্গে মাখামু! 

মা‌ডিতে একটু ঠাই দিবা বা‌হে…

একটু ঠাই দিবা বা‌হে…

ঠাই দিবা বা‌হে_____