রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ (DNA) প্রযুক্তি – সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

এক কোষ থেকে সুনির্দিষ্ট জিন নিয়ে অন্য কোষে স্থাপন ও কর্মক্ষম করার ক্ষমতাকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হয়। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় তাকে রিকম্বিনেন্ট DNA (DeoxyriboNucleic Acid) – প্রযুক্তি বা জিন ক্লোনিং বলা হয়। এ পদ্বতি প্রয়োগে কোন সুনির্দিষ্ট জিনসহ DNA (DeoxyriboNucleic Acid) অণুর অংশকে কোষের বাইরে ছেদন করে ব্যাকটিরিয়ার প্লাজমিড DNA (DeoxyriboNucleic Acid)- তে প্রতিস্থাপন করা হয়। এভাবে গঠিত নতুন জিন ব্যাকটিরিয়ার মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় এবং অন্য কাঙ্ক্ষিত জীব কোষে প্রবেশ করানো হয়। পরবর্তিতে এ জীবে নতুন জিনের বহিঃপ্রকাশকে পর্যবেক্ষন করা হয়।

১৯৭২ সালে পল বার্গ প্রথম রিকম্বিনেন্ট ডি.এন.এ প্রস্তুত করলে ১৯৮০ দশকে রিকম্বিনেন্ট ডি.এন.এ নিয়ে রিসার্চ শুরু হয় এবং বায়োটেকনোলোজির একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে শুরু করে। ইতোমধ্যেই মানবসমাজ এর থেকে লাভবান হতে শুরু করেছে। জীবন-জ়ীবিকার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি্র সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে DNA (DeoxyriboNucleic Acid) -এর কাঙ্ক্ষিত অংশ ব্যাকটিরিয়া থেকে মানুষে, উদ্ভিদ থেকে প্রাণিতে, প্রাণি থেকে উদ্ভিদে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে। এ ধরনের জীবকে বলা হয় GMO (Genetically Modified Organism) বা GE (genetically engineered) বা ট্রান্সজেনিকস।

এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। কৃষি গবেষণায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পর্যন্ত অনেক ট্রান্সজেনিক ফসল আবিষ্কার করা হয়েছে। তার মধ্যে উন্নত প্রজাতির ধান উল্লেখযোগ্য। এই প্রযুক্তির সুষ্ঠ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের খাদ্য সমস্যা অনেকটা দূর করা সম্ভব।

রিকম্বিনেন্ট DNA থেকে ট্রান্সজেনিক ফুড ।                               ফটো ক্রেডিট(theindependentbd)

এই রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি সবচেয়ে সফলভাবে আমূল পরিবর্তন এনেছিল ইনসুলিন  উৎপাদনে। আমরা জানি যে, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিন একটা অপরিহার্য উপাদান। ইনসুলিন মানুষের অগ্ন্যাশয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের এই হরমোনটি কম থাকে বলে, তাদের কৃত্রিমভাবে ইনসুলিন নিতে হয়। তো, আগে রোগীদের জন্য এই ইনসুলিন সরবরাহ করা হতো শূকর থেকে। শূকর হত্যা করে ইনসুলিন সংগ্রহ করতে হতো তখন।

এরপর রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ইনসুলিন উৎপাদন শুরু হয়। এক্ষেত্রে ইকোলাই ব্যাকটেরিয়া  ব্যবহার করে কম খরচে অধিক পরিমাণ ইনসুলিন উৎপাদন সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়ায়, মানুষের শরীরের ইনসুলিন উৎপাদনকারী জিনটি এনজাইম দ্বারা কর্তন করে ইকোলাই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএতে স্থাপন করা হয় এবং ল্যাবরেটরিতে ইলোকাই ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার করানো হয়। ওই ট্রান্সজেনিক ইকোলাই ব্যাকটেরিয়াগুলোই ইনসুলিন উৎপাদন করে।

রিকম্বিনেন্ট DNA থেকে ইন্সুলিন ।                                  ফটো ক্রেডিট – nlm.nih.gov

যুগ আগাচ্ছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সব কিছুই আগাচ্ছে। দিনদিন এই প্রযুক্তির ব্যবহারের খাত প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর পছন্দের তালিকায় শীর্ষে জিন প্রকৌশল ও জীব-প্রযুক্তি বিষয়টি। আশা করি, একদিন বাংলাদেশ এই খাতে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে, নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে নব দিগন্ত উন্মোচন করবে।