নতুন রূপ নিচ্ছে করোনা ভাইরাস!

➤করোনা ভাইরাস কী?
করোনা ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরনের করোনা ভাইরাস। ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি হয়তো মানুষের দেহকোষের ভেতরে ইতোমধ্যে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। ফলে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সোমবারই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে।

➤কতটা ভয়ংকর এই ভাইরাস?
এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তবে এর পরিণামে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের দুই শতাংশ মারা গেছেন, হয়তো আরও মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয়নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ংকর, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এক দশক আগে সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল সেটিও ছিল এক ধরনের করোনা ভাইরাস। এতে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ। আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মিডল ইস্টার্ন রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের।

➤করোনা ভাইরাসের লক্ষ্মণ কী?
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনও কোনও রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

➤কীভাবে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস?
মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।
তবে ঠিক কীভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেরনি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনও প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনও মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এর আগে সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে ঢোকার নজির রয়েছে। আর মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উট থেকে।

করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো

কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে উহানের ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো।

➤এর চিকিৎসা কী?
ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনই এর কোনও টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এমন কোনও চিকিৎসাও নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে।

আপাতত প্রতিকার হিসেবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা। ডাক্তারদের পরামর্শ, বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ নির্দেশনায় বলছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মুখোশ পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মুখোশ পরুন।’

➤করোনার ১১ পয়েন্টের ‘চেকলিস্ট’
১.করোনা হল কমন রেসপিরেটরি ভাইরাস ইনফেকশন।
২.মূলত জন্তু জানোয়ারের থেকে নোবেলা করোনা প্রকৃতির এই ভাইরাস থেকেই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হচ্ছে।
৩.দেখা যাচ্ছে মাছ থেকে এবং মাছের বাজার থেকে এই সংক্রমণের উৎপত্তি।
৪.ভাইরাল ইনফেকশনে মানুষ যেভাবে সর্দি, কাশই , জ্বরে আক্রান্ত হয় এই ভাইরাসেও তেমনই লক্ষণ দেখা যায় এবং এর থেকে হয় নিউমোনিয়া। যার থেকে প্রবল শ্বাসকষ্ট হয়। এমনকী লাংসেও জল জমে।
৫.এই ভাইরাসের মোকাবিলায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
৬.পশুর লোম এবং মল থেকেও সংক্রমণের আশঙ্কা।
৭.মানুষের শরীর থেকেও পশুদের দেহে এর সংক্রমণ ঘটে।
৮.করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হাঁচি দিলে বা কাশলেও তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
৯.কথা বলার মতো দূরত্ব, হ্যান্ডশেক করার মতো দূরত্ব থেকেও করোনা ভাইরাস একজনের থেকে অন্যের শরীরে প্রবেশ ঘটায়।
১০.করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের চশমা অন্যজন ব্যবহার করলে তা থেক সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।
১১.ডায়ালেসিসে থাকা রোগীর থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত বা কিডনি বা লিভারের অসুখে ভুক্তভোগীদের খুব সহজেই কাত করে দিতে পারে এই করোনা ভাইরাস । যা থেকে মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।
★চীন ও বিশ্বজুড়ে নতুন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে ৬৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার সাতশ’ কোটি টাকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) পরিচালক তেদ্রোস আধানম ঘেব্রেইয়েসাস বলেন, সেসব দেশ নিয়ে আমি বেশি উদ্বিগ্ন যেসব দেশে ভাইরাস আক্রান্তদের শনাক্ত করার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেসব দেশে রয়েছে, ভাইরাস আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসায় এবং মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় তাদের জরুরিভিত্তিতে সাহায্য দরকার।
বিভিন্ন দেশে নতুন করোনা ভাইরাস থেকে গণস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরিভিত্তিতে সাহায্য করার জন্য ডব্লিওএইচও-সহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ও সম্পদ অনুযায়ী কৌশলগত প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (এসপিআরপি) নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময়ের কথা মাথায় রেখে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাস সংক্রমণ কমানো। বিশেষ করে যেসব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল, সেসব দেশে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও পৃথক অবস্থায় রেখে চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে সাহায্য দেওয়া হবে। এছাড়া, দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব কমাতে, ঝুঁকি ও অন্য বিষয়ে সঠিক তথ্য মানুষকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করা ইত্যাদি।
অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আগেই তাদের সুরক্ষা করার বিষয়টি এ পরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানান ডব্লিওএইচও’র জরুরি স্বাস্থ্য কার্যক্রম প্রধান ডক্টর মাইক রায়ান।

লেখক : ইমাম সিদ্দিক সাহিত্য, শিক্ষার্থী, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল ।