আরাকান আসলে কাদের—তিব্বতীয় বার্মিজ জাতির নাকি রোহিঙ্গাদের?

১৪২৯ থেকে ১৫৩১ পর্যন্ত আরাকান বাংলার সালতানাতের অধীনে ছিল। এরপর পর্তুগীজরা তাদের অধীনে নেয়। পর্তুগীজরা চট্টগ্রাম দখল করে ধীরে ধীরে আরাকানে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ১৬৬৬ সালে মুঘলদের সাথে এক যুদ্ধে পর্তুগীজরা চট্টগ্রামের উপর অধিকার হারায়। সুতরাং মুঘল বিজয় পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের অধীন ছিল। ১৭৮৫ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে নির্যাতন শুরু করে। তার অত্যাচারে আরাকানের মগ ও রাখাইনরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে ।

আরাকান পর্বতমালা বা ইউমা রেঞ্জের পাদদেশে ৩৬,৭৬২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বিস্তৃত। এটি আরাকান পর্বতমালা দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আকিয়াব এর পূর্বতন রাজধানী। আরাকানের পৌরাণিক গল্প দাবি করে রাখাইনদের ইতিহাস শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২৫ সালে। যদিও এর প্রত্নতাত্ত্বিক কোন প্রমাণ নাই। র্তমান সংখ্যাগুরু রাখাইনরা তিব্বতীয় বার্মিজ জাতি যার শেষ দলটি আরাকানে প্রবেশ করে দশম শতাব্দীর পর থেকে।

খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৬৬ থেকে ১৪০৬ সাল পর্যন্ত আরাকান মোটামুটি স্বাধীন রাজ্য ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ থেকে ২০০০ শতকে বিহারের মগধ থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম প্রচার করতে আরাকান রাজ্যে এবং বার্মার অন্য এলাকায় আসে। তখন থেকেই বার্মার শাসকেরা নিজেদের মগধ বংশীয় বলে পরিচিত হতে চাইতো। এমনকি রাজধানীর নামও ভারতীয় নাম থেকে নিতো । অন্য ঐতিহাসিকদের মতে সম্রাট অশোক মগধ দখল করলে যারা বিতাড়িত হয়ে আরাকান এসেছিল তারাই পরবর্তীকালে আরাকানের মগ জাতি বলে পরিচিত।

দশম শতাব্দিতে সান উপজাতি কিছুদিনের জন্য আরাকান দখল করে। দ্বাদশ শতাব্দিতে বার্মার প্যাগান বংশ উত্তর আরাকান দখল করে রাজ্য বিস্তার করে। প্যাগান রাজবংশ বা পৌত্তলিক সাম্রাজ্য ছিল প্রথম রাজ্য যা ঐ অঞ্চলকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং পরবর্তীকালে আধুনিক মিয়ানমার গঠন করে। ইরাবাদি উপত্যকায় প্যাগানদের ২৫০ বছরের শাসন এবং এর পরিধি বার্মিজ ভাষা ও সংস্কৃতির উত্থানের ভিত্তি, উচ্চ বার্মায় বার্মা জাতি বিস্তার এবং বার্মায় থেওয়াদা বৌদ্ধধর্মের প্রসার এবং মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য ভিত্তি স্থাপন করে। রাজা অনাভ্রতা প্যাগান কিংডম প্রতিষ্ঠা করে ইরাবাদি উপত্যকায়।

Rakhine Silver Coin
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রাজা নিতীশচন্দ্রের আমলের সিলভার মুদ্রা; ছবিসূত্র : https://en.wikipedia.org

১২ শতকের শেষের দিকে অনাভ্রতার উত্তরাধিকারীরা দক্ষিণের অধিকতর উচ্চ মরলীয় উপদ্বীপে পূর্বের দিকে, সাবলিন নদী পর্যন্ত পূর্ব দিকে, বর্তমান উত্তর সীমান্তের নিচে এবং পশ্চিমে উত্তর আরাকানে বিস্তৃত করেছে।
আরাকান রাজা সেসময় গৌড়ের সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের সভায় আশ্রয় নেন। ১৪০৬ থেকে ১৪৩০ আরাকান বার্মার অধীন ছিল।১৪৩০ সালে গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দীন মহাম্মদ শাহের সহায়তায় আরাকান রাজ্য বার্মার কাছ থেকে মুক্তি পায়। ১৫৫৪ সালে দিল্লীর সম্রাট শের শাহের আত্মীয় শামসুদ্দীন মহাম্মদ শাহ সমগ্র চট্টগ্রাম ও আরাকান দখল করে নেন। ১৫৮০ সালে চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে চলে যায়। মোগল বিজয় পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের অধীন ছিল।

ম্রক-ইউ আরাকানের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাজত্ব ছিল। ম্রক-ইউ রাজবংশ ৩৫০ বছর রাজত্ব করেছিল। বাংলার পূর্ব প্রান্তের উপকূল ঘেষে ম্রক-ইউ শহরকে কেন্দ্র করে এই রাজবংশ গড়ে উঠে । সপ্তদশ শতাব্দির প্রথম দিকে ম্রক-ইউ এর সোনালি শহর ইউরোপেও পরিচিতি লাভ করে। ফ্রায়ার শেবাশচিয়ান মনরিখ একে প্রাচ্যের ঐশ্বর্য হিসেবে অবহিত করেন। এই রাজবংশ ১৪২৯-১৭৮৫ পর্যন্ত আরাকান, মিয়ানমার ও চট্টগ্রাম শাসন করে। একটি উল্লেখযোগ্য রাজধানী হিসেবে ম্রক-ইউ কে খুব যত্ন এবং গুরুত্বের সাথে তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা করে তিনটি ছোট পাহাড়কে লেবেলিং করা হয়েছে। প্যাগোডাগুলো পাহাড়ের চূড়ায় বসানো হয়েছে। সময়ে এগুলো যেন দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অসংখ্য প্যাগোডা এবং বৌদ্ধ মন্দির পুরনো শহর এবং পাহাড়ের চারপাশে এখনো ছড়িয়ে আছে। কিছু কিছু মন্দির এখনো প্রার্থনাস্থল হিশেবে ব্যবহার করা হয়।

১৪২৯ থেকে ১৫৩১ পর্যন্ত আরাকান বাংলার সালতানাতের অধীনে ছিল। এরপর পর্তুগীজরা তাদের অধীনে নেয়। পর্তুগীজরা চট্টগ্রাম দখল করে ধীরে ধীরে আরাকানে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ১৬৬৬ সালে মুঘলদের সাথে এক যুদ্ধে পর্তুগীজরা চট্টগ্রামের উপর অধিকার হারায়। সুতরাং মুঘল বিজয় পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের অধীন ছিল। ১৭৮৫ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে নির্যাতন শুরু করে। তার অত্যাচারে আরাকানের মগ ও রাখাইনরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে ।

১৪০৬ থেকে ১৪৩০ এর মধ্যে আরাকানের অনেক মগ বা রাখাইন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৬৬৬ থেকে ১৭৮৫ সালের মধ্যে আরাকানের করদ রাজ্য চকমা যা বর্তমানে মিজরাম থেকে বর্তমান চাকমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আসে। ১৭৮৫ সাল থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে বার্মার শাসন, ১৮২৬ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত জাপানি শাসন এবং পুনরায় ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন এবং ১৯৪৮ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বার্মার শাসনের অধীন।

জাতিগত দ্বন্দ্ব মিয়ানমারের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। মিয়ানমারের জাতিগত দাঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাঙ্গা বা গৃহযুদ্ধ। কচিন, কায়াহ, কাইন, রাখাইন এবং শান প্রদেশে এই জাতিগত সংঘাত সবচেয়ে বেশি। জাতিগত দলের মধ্যে কারণে মোট জনসংখ্যার ৭% (থাইল্যান্ড সীমান্ত), কাচীন ১.৫% (চীন সীমান্ত), কারেন্নী ০.৭৫% (থাইল্যান্ড সীমান্ত), চিন ২.৫%ভারত সীমান্ত), মন ২%, রাখাইন ৩.৫%, শান ৯% (থাইল্যান্ড সীমান্ত), ওয়া ০.১৬% (চীন সীমান্ত) এবং রোহিঙ্গা ০.১৫% (বাংলাদেশ সীমান্ত)।

ব্রিটিশ শাসক মিয়ানমারকে স্বাধীনতা দেয়ার আগে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিকে একত্রিত করতে চেয়েছিল। ব্রিটিশ অফিসারদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ছোট ছোট জাতি “প্যাংলং চুক্তি” স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী তারা ঔপনিবেশিক পরবর্তী শাসনে একত্রিত হয়ে কাজ করবে এবং উপজাতিদের অধিকার ও আত্মনির্ভরশীলতা নিশ্চয়তা দেয়া হবে।এর মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বিলুপ্ত হবে।

আরাকানের রোহিঙ্গারা বেশিরভাগ মুসলিম জাতিগোষ্ঠী। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদের জাতীয়তা অস্বীকার করে। তাদের রোহিঙ্গা না বলে বাংলাদেশি বলে অবহিত করে। এমনকি জঙ্গিও বলে তাদের দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। অতিসম্প্রতি ৫০০,০০০ রোহিঙ্গা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়—যা দেশটির সরকার কর্তৃক জাতিগত নিধন “টেক্সটবুক ইগজাম্পল” শুরু করে। খুন, ধর্ষণ, গণহত্যা করে তারা রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করে।

Rohingya Crisis
আরাকানে রোহিঙ্গা ক্রাইসিসের চিত্র; ছবিসূত্র : https://www.abc.net.au

ব্রিটিশ শাসন আমলে মিয়ানমার, ভারত, বাংলাদেশে ব্যাপক দেশত্যাগের ঘটনা ঘটে। ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতার সময় সরকার “এক্ট” পাস করে যেখানে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মেনে নেয়া হয়নি। তবে ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু পরিস্থিতি খুব খারাপ পর্যায় চলে যায় ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুথানের পর। ১৯৭৪ সালে দেশটির সকল নাগরিকের নাগরিকত্বের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র দরকার হলে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়।

Genocide over the Rohingya
পুড়ে যাওয়া রাখাইন প্রদেশ; ছবিসূত্র : https://globalriskinsights.com/

১৯৮০ সালে এক আইন পাস করা হয় যাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়া আর কঠিন হয়ে পরে। ১৯৮৯ সালে দেশটির নতুন নাম হয় মিয়ানমার। সহিংসতা শুধু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয় সব মুসলিমদের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পরে।কিছু কিছু উগ্রবাদি বৌদ্ধ ভিক্ষু ইসলাম বিরোধী আতঙ্ক ছড়াতে থাকে। এই ভিক্ষুরাই “জাতি এবং ধর্ম” আইন পাস করায় জাতে মুসলিম নিধন করে তাদের মোট জনসংখ্যা কমাতে পারে। এভাবেই শুরু হয় বিশ্ব ইতিহাসের ভয়াবহ গণহত্যা ও জাতিগত নিধন। আরাকান তথা রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমরা শিকার হয় ইতিহাসের নির্মম অত্যাচারের।