ঢাকা সিটি নির্বাচন, নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটার শূন্যতা: জাকারিয়া নাহিদ

লেখক ও গবেষক জাকারিয়া নাহিদ: শেষ হয়েছে বহুল আলোচিত ঢাকা মহানগরের দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। সর্বোচ্চ সাতাশ ভাগ ভোট কালেকশন হয়েছে যার ১৬/১৬ ভাগ পেয়ে দুই মেয়র মহোদয় নির্বাচিত হয়েছেন। শুভ কামনা রইলো স্বল্প ভোটে নির্বাচিত নতুন দুই নগরপিতা মহোদয় জনাব আতিকুল ইসলাম এবং জনাব ফজলে নূর তাপস সাহেবের জন্য। ভোটার সংখ্যা যাই হোক আপনারা বর্তমান নগরপিতা তাই আপনারা জনগণের সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এরকমই কামনা করছি।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এত কম সংখ্যক ভোট সংগ্রহীত হওয়ার পিছনের কারণগুলো কি?? জনগণের চিন্তাভাবনা গুলোই বোঝার চেষ্টা করেছি। সেগুলোকেই একসাথে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

নির্বাচন কমিশন: নির্বাচন কমিশনটা যে দিনে দিনে অথর্ব এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে যাচ্ছে তা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দিয়ে প্রতীয়মান হয়। প্রথমত নির্বাচন কমিশন জানুয়ারি ৩০ তারিখে সরস্বতী পূজার দিন নির্বাচনের তারিখ ঠিক করে। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনের মুখে তারিখ পরিবর্তন করে পহেলা ফেব্রুয়ারি করা হয়। কিন্তু পহেলা ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ হরার প্রেক্ষিতে পরপর তিনদিন বন্ধের একটি সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগ নিয়ে অনেকেই ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে কিংবা ভ্রমণে বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন এসব বিষয়গুলো চিন্তাভাবনা না করেই নির্বাচনের তারিখ ঠিক করেছিলো বলেই জনগণ মনে করেন। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে অনেকেই ভোট দিতে পারেন নাই।

ইভিএম জটিলতা: আমাদের অনেকেরই ইভিএম সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নাই। স্বল্প পরিসরে নির্বাচন কমিশন মানুষকে ইভিএম সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলো। যা জনগণের কাছে পৌঁছেছে বলে মনে হয় না। যেখানে আমি ইভিএমে আমার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সন্তুষ্ট হয়েছি, সেখানে ইভিএম আতঙ্কে অনেকে ভোটকেন্দ্রেই যান নাই। ইভিএম একটি চমৎকার সুন্দর ভোটিং সিস্টেম। যা সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছতে হবে আরও সুন্দর সহজ হবে। ইভিএম সম্পর্কে জনগণের ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই এবারের ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজেদের ভোট প্রয়োগ থেকে বিরত ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে।

বিএনপি এবং অযোগ্যতা: বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে ঢাকা সিটি নির্বাচনে আবারও প্রমাণ হয়েছে। এমন দুজন প্রার্থীকে বিএনপির ঢাকা সিটির নির্বাচনে জন্য বাছাই করেছেন যারা বিএনপির তৃণমূল এবং সাধারন জনগনের কাছে পৌঁছতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মেয়র প্রার্থীগণ পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত দেননি। কারো কারো পুলিং এজেন্ট নির্বাচনের দিন কক্সবাজারে পারিবারিক ভ্রমণ সেরেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এসেছে দেখা গেছে। মেয়র প্রার্থীরা পোস্টার পর্যন্ত ছাপান নাই জনগণের পর্যন্ত জাননি। শুধুমাত্র এটা নাই সেটা নাই করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই বিএনপি নির্বাচনের প্রার্থী দিয়েছিলো। এইসব কারণে বিএনপি প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ছিটেফোঁটাও ছিলো না। যেখানে প্রার্থী অযোগ্য সেখানে জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আর কি ভোট দিবেন এরকম একটা ধারণাও মানুষের মধ্যে ছিলো।

আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের এত সমর্থক গেল কই: আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রত্যেকটি নির্বাচনী প্রচারণা উপচে পড়া মানুষের ভিড় দেখা গিয়েছিলো। ভোটের দিনে এই উপচেপড়া ভিড় গুলো কোথায় গিয়েছিলো?? তাহলে কি এই উপচে পড়া ভিড় টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাড়া করে আনা?? ভাড়া করা লোক দিয়ে হয়তো সোঅফ দেখানো গিয়েছে কিন্তু ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি।

ভাই লীগের প্রাধান্য: আওয়ামী লীগে যে দিনকে দিন ভাই লীগের প্রাধান্য বাড়ছে তা এবারও প্রমাণ হলো। ভাই লীগের সদস্য হতে হলে আসলে কি লাগে?? ভাই লীগের সদস্য হতে হলে কারও ক্ষেত্রে হোন্ডা প্রয়োজন কারো ক্ষেত্রে বেয়াদব (যখন তখন যে কারো সাথে বেয়াদবি) করার ক্ষমতা থাকতে হয়। আর এই ক্ষমতা গুলি সাধারণত শিক্ষিত ভদ্র মানুষদের মধ্যে থাকে না। অশিক্ষিত বর্বর এবং স্কুল কলেজের গন্ডি পার না হওয়া ছোট ছেলেদেরকে দিয়ে এই কাজগুলো করানো হয়। এই ছেলে গুলোদেরকে দিয়ে আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক চাঁদাবাজি ছিনতাই মাদকের ব্যবসার মতো ঘৃণিত কাজ করেন। এবং তাদেরকে প্রয়োজনে মিছিল-মিটিংয়ে নিয়ে যায়। এরা কি আসলে জনগণকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসার যোগ্য?? এদের অশালীন বেয়াদবি মার্কা আচরণের জন্য সাধারন জনগন ভোট কেন্দ্র বিমুখ হয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকরাই ভোট দেন নাই: বাংলাদেশের একটি বড় অংশই বর্তমানে আওয়ামী লীগের সমর্থন করে বলে দেখা যায়। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের ফলাফল দেখলে তা তো বুঝা যায় না। আওয়ামী লীগ সহ সহযোগী সংগঠনগুলোর ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন জায়গার নেতাকর্মীরাই তো সবাই তাদের ভোট প্রয়োগ করেন নাই।

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ: সাধারণ কাউন্সিলর এবং মহিলা কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের নিজেদের মধ্যের মারামারি কাটাকাটির অংশ হতে চায় নাই। তাই অনেকেই হয়তো ভোটদান থেকে বিরত ছিলো।

যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা: নির্বাচনের মাঠে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী অভাব পদে-পদে দেখা গিয়েছে। অনেক অযোগ্য ব্যক্তি বিভিন্ন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। যারা জনগণের হৃদয়ে প্রবেশ করার যোগ্যতা রাখেন না। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে বিএনপি কেন তাদের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে তাবিদ আউয়ালের মত একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজকে মূল্যায়ন করলো?? জনগণ আশাহত এসব দেখে দেখে।

একটা চল উঠেছে ভোটকেন্দ্রের না গেলেও নাকি ভোট হয়ে যায়। বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার উপায়ও নাই। এই অবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে আরো বাজে সময় দেখতে হবে। নির্বাচনে ভোটদান আমার নাগরিক অধিকার বলেই আমি মনে করি। আমি আমার কর্মস্থল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে আমার নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করেছি। চেনাজানা অনেককেই বলতে শুনেছি ভোট দিয়ে কি হবে, তারা আসেন নাই কোনভাবে ভোটকেন্দ্রে। কিন্তু বড় কথা বলতে তারা পিছ পাও হয় না।

আমার অধিকার আমি যদি প্রয়োগ না করি তাহলে তো দিনকে দিন অকালকুষ্মাণ্ডদের হাতে এগুলো চলে যাবেই। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, রাষ্ট্রযন্ত্র এদের যেমন দায়িত্ব আছে ঠিক তেমনি সাধারণ জনগণেরও অনেক দায়িত্ব আছে। আমরা আমাদের নিজেদের দায়িত্ব পালন না করে শুধুমাত্র অন্যের দোষ-ত্রুটি ভুলগুলো দেখার চেষ্টা করি যা ঠিক নয়। 

আসুন পুরনো ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রাণের শহর ঢাকাকে দল-মত নির্বিশেষে সবাই মিলে বাসযোগ্য নিরাপদ নগরীতে রূপান্তর করি। সবাই সবার জায়গা থেকে তার নির্দিষ্ট দায়িত্বটি পালন করি। তাহলেই ঢাকা হবে তিলোত্তমা ঢাকা।