কক্সবাজার যাওয়ার পথে আর কী কী দেখবেন?

[su_heading size=”19″ margin=”30″]শরীর-মন অবসন্ন! হিম শীতলের সন্ধানে মন অস্থির। হয়তো এই বেলা আপনার পরিকল্পিত ভ্রমণ সূচীতে নিশ্চয় স্থান পাবে কোনো শৈলশহর। দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ-বন-পাহাড়-সৈকত-গিরি-ঝরনা।[/su_heading] পাহাড়ের পাদদেশে স্বচ্ছ-সুনীল হ্রদ, অতলস্পর্শী ঝরনা, খরস্রোতা নদীর কল্লোল, উষ্ণ প্রস্রবনের চুম্বন, গহীন অরণ্যের ফোকরে লাজুক রোদ, শন শন ঝাউপাতা ঝরানো নির্মল হাওয়া। এসব কিছু নিশ্চয় ডাকছে আপনাকে ছুটির দিনে। নাগরিক জীবনের একঘেয়ে যান্ত্রিকতা, জীর্ণতা, কৃত্রিমতা ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ুন। আসুন পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত পর্যটননগরী কক্সবাজারে। এখানকার সবুজ বনানী, নীল আকাশ, আদিগন্ত সৈকত আপনার চোখে মুগ্ধতার কাজল এঁকে দেবার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। প্রতিবছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অগুনিত ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ আসে এখানে।

কী কী দেখবেন?
গোটা কক্সবাজার জেলা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র দর্শনীয় স্থান। প্রাচ্যের সৌন্দর্য-সম্রাজ্ঞী কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—চুনতির অভয়ারণ্য, চকরিয়ার সাফারী পার্ক, রামুর রাবার বাগান, ঐতিহ্যবাহি রামকোট তীর্থস্থান, বৌদ্ধমঠ, নারকেল বাগান, সবুজ-শ্যামল আঁকাবাঁকা বাঁকখালি নদী, নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ি লেক-ঝুলন্ত ব্রিজ, সমুদ্রের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হিন্দুদের তীর্থস্থান মহেশখালি আদিনাথ মন্দির, রাঙা সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি, কুতুবদিয়ার বাতিঘর, কক্সবাজার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, রামু হিমছড়ির মনোরম ঝরনা, উখিয়ার সমুদ্র সৈকত ইনানী, সবুজ বনবনানী, টেকনাফের নেটং পাহাড়, কুদুমগুহা, নেটং ঝরনা, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের যোগসূত্র মন ভোলানো নাফনদী, বৌদ্ধকয়াং, টেকনাফ সৈকতের নৈঃসর্গীক হাতছানি, চিংড়ি প্রজেক্ট, ঘন সবুজ অরণ্য কাটাপাহাড়, ধীরাজ বিরহিনী মাথিনকূপ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ছেঁড়াদ্বীপ প্রভৃতি।

প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক কক্সবাজারের এইসব জায়গায় বেড়াতে আসেন। যার কারণে নির্দ্বিধায় কক্সবাজারকে বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী ও পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য বলা যায়।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]যেতে যেতে পথে সবুজের সমুদ্র ও সাফারী পার্ক[/su_heading]

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থেকে আঁকাবাঁকা বুনো রাস্তার মসৃণ পথ পেরিয়ে চলে গেছে আধুনগর। গভীর অভয়ারণ্য। চারদিকে ঘন জঙ্গল। মহাসড়ক থেকে এখানে নেমে চুনতি অভয়ারণ্যের যতই গহীনে যাবেন ততই অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করবে। যে দিকে চোখ যাবে মনে হবে চারদিকে সবুজের সমুদ্রের সমারোহ। এখানে দর্শনীয় স্থান—চুনতি অভয়ারণ্য, পদুয়া ফরেস্ট, গৌড়স্থানের প্রকৃতি।

এইসব প্রাকৃতিক দৃশ্যবলী ছেড়ে আপনি যখন চকরিয়া ঢুকবেন, ঢোকার আগেই মাতামুহুরির শীতল-উষ্ণ হাওয়ার অভিবাদন পেয়ে যাবেন। চকরিয়াকে পেছনে রেখে আপনি যখন ফাঁসিয়াখালি পার হবেন তখন সমতল ফুরিয়ে যাবে ধীরে ধীরে। দেখবেন রাস্তাটি এবার একটু একটু করে ওপরের দিকে উঠছে। সেই সাথে কমে আসছে ফসলি ক্ষেত আর লোকালয়। প্রথমে বিচ্ছিন্ন টুকরো টুকরো বনভূমি। চিলতে চিলতে ফসলের মাঠে দেখতে পাবেন কাজ করছে কৃষক বধূরা। সাফারী পার্কের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাবার পথে পড়বে তিন-চারটি পাহাড়ি জলধারা। যতই সামনে এগিয়ে যাবেন শাল-শেগুণের অরণ্য ততই গহীন হতে থাকবে। ভাগ্য সহায় হলে পথের অরণ্যে দু’চারটে বানর-হনুমান কিংবা একপাল হাতির দেখাও পেয়ে যেতে পারেন। হয়তো কোনো বন্যশূকর কিংবা সজারু আপনার আগমনে সচকিত হয়ে দৌড়ে অতিক্রম করবে রাস্তাটি। এরমধ্যে বার কয়েক দেখা হয়ে যেতে পারে বনমুরগীর সাথে। যাবার পথে পড়বে বিজেবি ও পুলিশ ক্যাম্প। এছাড়াও দু’তিনটে ছোট ছোট বাজার। তারপর সাফারী পার্ক-কে হাতের বামে রেখে আপনি আসতে থাকবেন কাঙ্খিত সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। এরমধ্যে আপনি চাইলেই ঢু মারতে পারেন ডুলাহাজরা সাফারী পার্কে। সেখানে আপনি দেখতে পাবেন বিরল প্রজাতির সব ফুল-পাখি, পশু ও গাছপালার বিশাল অভয়ারণ্য। এইসব দেখে আপনার থেকে যেতে ইচ্ছে করবে সাফারী পার্কেই।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]রামু রাবার বাগান, নারিকেল বাগান, রামকোট ও বৌদ্ধ কেয়াং[/su_heading]


সাফারী পার্কের লোভ সামলিয়ে আপনি যখন চলে আসবেন কক্সবাজার মুখে। আবারও দেখতে পাবেন পাহাড় ও সমতলের লুকোচুরি খেলা। এরপরই চোখে পড়বে রাস্তার দু’দিকেই সারি সারি রাবার বাগানের দৃশ্য। উঁচুনিচু চা বাগানের মত সব পাহাড়। এসব দেখে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। এখানে আপনি চাইলে থেকে যেতে পারেন একদিন। দেখতে পারেন রামকোট তীর্থস্থান, বৌদ্ধ কেয়াং, নারকেল বাগান, জাদী পাহাড়, নাইক্ষ্যংছড়ির প্রাকৃতিক লেক, বাঁকখালির আঁকাবাঁকা নদী ইত্যাদি।

ঐতিহাসিক রামকোট তীর্থস্থানে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ করে শ্রীলংকা, নেপাল ও ভারতের প্রচুর হিন্দুরা তীর্থ দর্শনে আসেন। প্রতিবছর এখানে রামনবমী উপলক্ষে সাতদিন ব্যাপী মেলায় বিভিন্ন রকমের হস্তশিল্প, শো পিস ও মৃত্তিকা শিল্প কিনতে পাওয়া যায়। প্রতিবছর এখানে ‘বিযু’ উপলক্ষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ‘বহুচক্র’ অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। এ অনুষ্ঠানে রশি ও বাঁশ দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট ঘর বানানো থাকে। এতগুলো ঘর যে, একবার ঢুকলে আর বেরিয়ে আসার উপায়ই থাকে না। অবশ্য বেরিয়ে আসার পথও রয়েছে। যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তারা কিন্তু বেশ বেকায়দার মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। বেরিয়ে আসার জন্য অনেক নাকানি-চুবানি খেতে হয়। কিন্তু ধীরে-সুস্থে আপনাকে প্রতিটি ঘরেই ঢু মেরে আসতে হবে। এটা যেন এক বিশাল ধৈর্য পরীক্ষাও।

ভ্রমণ করতে এসে এগুলো কিন্তু আপনার বাড়তি পাওয়া। এছাড়া এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ রচিত হয় প্রতিবছর। হিন্দু ও বৌদ্ধ একসাথে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালন করেন। যা দেশের অন্যান্য জায়গায় সচরাচর দেখা যায় না। রাম কোটের সামান্য অদূরেই রয়েছে সারি সারি সু-শৃঙ্খল বিশাল এরিয়া জুড়ে নারকেল বাগান। যা দেখে আপনার মন জুড়িয়ে যাবে। মুগ্ধ হয়ে যাবেন আপনি। তারপর রামু এসে হালকা বিশ্রাম নিয়ে আপনি হাতের দু’দিকে রাবার বাগান রেখে উঁচুনিচু বন পেরিয়ে দেখে আসতে পারেন দীর্ঘ পাহাড়ের উপর সুউচ্চ লম্বা জাদী পাহাড়। এখানে উঠলে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে সমুদ্র সৈকতের বিশাল গর্জন।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত[/su_heading]

রামু থেকে এবার যাত্রা শুরু করুন সমুদ্রমুখি। রাস্তার দু’পাশের ছোট ছোট ঝাউগাছের শন শন হাওয়া পেরিয়ে চলুন অদেখার আনন্দে। পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। আচমকা এঁকেবেঁকে পথ চলছে পাহাড় থেকে পাহাড়ের খাদ বেয়ে। হঠাৎ করে বাঁকের মোচড়ে অবগুণ্ঠন খুলে তাকিয়ে আছে বিশাল সমুদ্র। বঙ্গোপসাগর। সূর্য তখন হয়তো পাঠে গেছে। হয়তো যাচ্ছে। হয়তো এই প্রথম দেখছেন গাড়িতে বসেই সূর্যাস্ত। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন আপনি। এখানেই আপনার রাতবাস। সুন্দর পরিচ্ছন্ন আন্তর্জাতিক মানের প্রায় সব হোটেল-মোটেল। থাকতে পারেন সমুদ্রপাড়ের পছন্দমত একটিতে। হোটেলে উঠে পোশাক পাল্টে হয়তো ভাবছেন রাতেই বেরিয়ে পড়তে সমুদ্রে। হালকা কিছু পেটে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন। রাতের সমুদ্র সৈকত অপূর্ব। রাতের জলপরীরা গোসল সেরে শাড়ি পরে চলে যাচ্ছে আপনার পাশ ঘেঁষে। আবার বেশি ঘোরাঘুরি করাও ঠিক না রাতের সমুদ্রে। চোর-বাটপারদের ভয় আছে। সুতরাং হোটেলে এসে ডিনার সেরে এলিয়ে পড়ুন বিছানায়। সু-প্রভাতের প্রথম আলোয় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করুন সমুদ্র সাম্রাজ্যের অনন্য রূপ যৌবন। সোনালি রোদের আলোয় সমুদ্রে সূর্যস্নান সেরে উঠে পড়ুন গাড়িতে। কোথায় যাবেন?

[su_heading size=”19″ margin=”30″]হিমছড়ি ঝরনা ও ইনানী সৈকত[/su_heading]


যাত্রা শুরু আপনার সমুদ্রের বালিয়াড়ি বেয়েই ইনানী সৈকতে। এখানে সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট থেকে কোলাহল একটু কম। এটা পাথরে সৈকত। এখানে ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সৈকত জুড়ে। একেকটা ঢেউ এসে পাথরে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে। এ এক অসাধারণ দৃশ্য। এইসব দৃশ্য সাথে নিয়ে রোদ পড়ে যাওয়ার আগেই এইবার স্বপ্নের গন্তব্য হিমছড়ির অতলস্পর্শী ঝরনায়। মেরিন ড্রাইভ হয়ে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে বালিয়াড়ি বেয়ে ছুটবে গাড়ি। ঘন সবুজ বনের সম্মুখ হবে ভ্রমণ। পাশে বিশাল সমুদ্রের হাওয়া এসে আপনাকে উতলা করে দেবে। চেনা-অচেনা পাখ-পাখালির বাহারি রঙে, সুমিষ্ট গলার কোরাসে ফুটে উঠবে প্রকৃতির খেয়ালের সমতান। এরই মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া চুকিয়ে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের’ মত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সমুদ্রধারে অরণ্য এ যেন প্রকৃতির উষ্ণ খেয়াল। এখানে ঝরনার পানিতে হাতমুখ ধুয়ে অপার বিস্ময়ে হয়ে উঠবেন চাঙা। হিমছড়ি ঝরনার এখানে শুরু। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চলুন জলের জলসায়। আপনার সামনে দিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকা। তার কোলে রাস্তা গেছে হারিয়ে। ওপারে পাহাড়ের ঢাল থেকে নামছে জলের বন্যা। দূর থেকে মনে হয় পাহাড়ের কোলে ফুলের গালিচা। ফুলের জলসায় বাহারি প্রজাপতি, বুনোমথ, মৌমাছি গুনগুনিয়ে নেচে গেয়ে যায়। সেই গালিচায় উপচে পড়া জলের চাদরে আপনি আত্মহারা বাঁধনহারা স্বেচ্ছা নির্বাসনে বন্দি নিজের অজান্তে।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]কীভাবে যাবেন?[/su_heading]

ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। দামপাড়া বাস স্টেশন ও সিনেমা প্যালেস থেকে কক্সবাজার যাবার বাস পাওয়া যায়। নতুন চাঁদগা থানার সামনে থেকেও কিছু বাস ছাড়ে দশ মিনিট পরপর। ভাড়া পড়বে চেয়ারকোচ ২৫০ টাকা, এসি কোচ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আবার ঢাকা থেকেও সরাসরি কক্সবাজারের বাস পাওয়া যাবে।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]কোথায় থাকবেন?[/su_heading]


কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। যার মধ্যে রয়েছে—হোটেল সী-গাল, প্রাসাদ প্যারাডাইস, ইউনি রিসোর্ট, হোটেল অ্যালবার্টস, মোটেল প্রবাল, শৈবাল, নিটোল, উপল, সিলভিয়া রিসোর্ট, সী-কুইন, পালংকি প্রভৃতি। এসব হোটেলের ডাবল রুম ১০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত পড়বে। অফ সিজনে এদের অনেকেই হ্রাসকৃত অফার থাকে গ্রাহকদের জন্য।

[su_heading size=”19″ margin=”30″]কেনাকাটা[/su_heading]


আপনি চাইলে কক্সবাজারের বার্মিজ মার্কেট থেকে যা ইচ্ছে কিনতে পারেন। খুব সস্তায় এখানে পাওয়া যায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থায়ল্যান্ড, মিয়ানমার থেকে আসা চামড়া ও বিভিন্ন কাপড়ের পণ্য। তবে প্রত্যেক কিছুতেই দরাদরি আবশ্যক। না হলে ঠকবেন। একদর বলে এখানে কিছু নেই। এখানকার সুপারি ও শুটকি বিখ্যাত। খুব সস্তায় এসব এখানে কিনতে পাওয়া যায়। ঝিনুক মার্কেট থেকেও আপনি অনেক কিছু কিনতে পারেন। নানা রঙ বেরঙের সুন্দর প্রবাল, ঝিনুক ইত্যাদি যা আপনার ঘরের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেবে অনায়াসে।