মানুষ সিরিজ ।। নৈরিৎ ইমু

সব আয়োজন অপ্রাকৃত, শূন্যগর্ভের দিকে উড়ে যাওয়া পাখি
উড়তে শেখার আগেও শূন্যে ভাসছিল যার মাংস ও স্বেদ,
মানুষের দু-রত্তি অসুখের নীল, অমসৃণ সুর
যাকে বলা হয় সমুদ্ররত ভয়— পলকের পরে নেমে আসে পলক
সুমিষ্ট মদের ভেতর কি করে উজ্জ্বল হয়ে উঠে ব্যথা?
অনেক জন্মের তরে একাধিক কবর ও স্রষ্টা
কেন নৈবেদ্য তার ছায়া, আজ কার ছায়া নিতান্ত আশ্রয় !

সাধনাময় পতঙের ডানা। ভাঙছে অকূল অন্ধকার তার ঝাপটায়
আর কাকে আঁকছে সুবর্ণ কাঁকন ঘুমহাতে
যে নির্ণয়, এই কূজনে, এই হরিৎ-এ আর  গ্রাসকৃত সূর্যের সম্মুখে
শুধু বিনম্র অন্ধকারের কথাই তো বলে,
বলুক তবে রক্তকণিকায় নেচে উঠেছে ফুটন্ত তমোরস
পথের অভ্যন্তর হতে খুলে পড়েছে গোপন কপাট
যেখানে যাবার জন্য অরণ্য ও পর্বত সংযত হৃদয় হতে
ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষিপ্ত শোক, পাতার মর্মর ও অর্ধস্ফুট পাথর
মানুষ কুড়িয়েছে তার সমস্ত ঐশ্বর্য  ভেবে
তারকার দিকে মেলে অসফল অতৃপ্ত চোখের ব্যর্থতা
ঘনীভূত অন্ধকারে-অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে শত মূর্দারের বেশ ধরে একা একা।

 

২.
সব ভঙ্গিমাই জীবন্ত হতে চায়, মানুষ স্বজন—
এই ভেবে কাছে আসে উড়ন্ত কিছু প্রাণ
রোদ-সুষমায় শুধু ব্যর্থ সীমা, অনন্ত-ঊর্ধ্বলোক
সেইদিকে—বৃক্ষচূড়া হতে উড়ে যায় কতিপয় শ্বাস
উড়ার একপ্রস্ত লোভে সহযাত্রীর সাথে
দেখা হবে কোনদিন! যার দিকে যথেচ্ছ অহং
ছিল সরল পাহাড়। কেন এত বিচ্ছুরণ—
অস্থির অস্থির করে নিয়ে চলে চীরস্থিরতার দিকে?

মানুষ জানে—কোনদিন এই ভূমি সমুদ্রে যেতে না চায়,
তবু সমুদ্রই বড় প্রয়োজন। যেন মমতার স্মিত হাসির পাশে
মরে যায় ভিখিরীর জলসাদৃশ্য হাত, সেই জলে
বারো নাবিক ডুবেছিলো বারোটি গানের শেষে।

 

৩.
সয় না আলোক চূর্ণ, মগজে  মূদ্রার নাচ
শুধু ঝনঝন করে বাজে। কেন কুণ্ঠিত হয়ে থাকা
ফুটাও অপূর্ব রঙ, এ পুষ্প— চূড়ান্ত লীলা
কবেকার ঘোর এসে লীন করে অস্তিত্ব অপার
মেঘলা যেটুকু ঘনীভূত ঘোরকান্না, মানুষ খেলা মাত্র
খেলার ছলে উদ্বাহু হয়ে থাকা সয় না, যদি ওপ্রান্তে
অপরাহ্ণ জাগে, জাগুক প্রকার যত তাচ্ছিল্য বাঁচার
‘তুমি’ বলে কিছু নেই, কোথাও কোন দিগন্তের রেখা ছিঁড়ে
আমিই লুটিয়ে পড়ি মৃত্তিকায়। হায় মূদ্রার নাচ
মগজে ঝনঝন বেজে চলে বাঈজী সমান!

উমা, মানুষ বড় বিভ্রান্তির জাল— আটকে যাই

যে বীজ অসীম ক্ষমতার, না জেনে শুদ্ধ বপন—
কী করে অঙ্কুর জাগাই, কী করে আমাকে জাগাই!

8.
আলোড়ন সেতো কোন অন্ধ কুসুমেরও হয়
অক্ষত রঙ, মানুষের ক্ষতগুলো সেইরূপ
সমস্ত গহ্বর ছেড়ে যেনো নোঙরই প্রধান
এই বরফ শীতল দেহ অর্ধমৃত, যত সংক্রমণ
তবে কেন সন্ধ্যার সোডিয়াম আলো ফেলে গৃহমুখী
যাত্রায়— রেখে যাই পদব্রজে কত হ্রদ?
যে হাত ডেকে নেয়, তার আঙুলে— জাগে আশ্চর্য ভাষা
আঙুল সে কোনকালে অবিরত বুনেছিলো বিরল ক্ষোভ
জানা নেই মেঘের স্বরূপ! কেন নেই, জানে না বলেই প্রাণ—
যতদূর ডুবুরিপাখির বেশ, বোধয় জীবন ঠিক ততটাই!
শুধু অক্ষম গান শুনে, থেকে যাওয়া দীপ্তিহীন
নির্নিমেষ পাখির আয়ু, আরও  দ্রুততর নিষ্কৃতি কোন
প্রস্থানোদ্যত উদ্মাদও এঁকে ফেলে চাঁদসূচালো—ফলে ভরে যায় উজ্জ্বলতায়, অসুস্থযাপনের সাধ!

সবিস্ময় মানুষেরা হায় কাঁদতে শিখবে কবে
কান্নার অতর্কিত শান্তির নিশ্চয়তায়!

৫.
কে চায় পরিত্রাণ? অন্ধ বীনায় যত পূত সুর
স্মরণোপমার দিকে সমস্তই নিভৃত গহন
কেন অবক্ষয়, এই নিদ্রিত রূপ! নিজস্ব উদ্যানে
ভিখিরি শিশুর মতো বসে থাকা, বাষ্পকলি আহা!
যেনো নিরূপিত ব্যথা সমুদ্র হতে একাঙ্ক নিস্তার
এতটা ন্যুব্জ হতে নেই— তবু সমর্পিত আগুনে
পুড়ে ছাই হয়ে যায় ডানার ভাষা। নক্ষত্রচারী ওগো,
রোমন্থনে বহুমূল্যের তৃষ্ণা, মানুষ নদীর মতো—
উৎসের নিকট আর ফেরে না। দীর্ঘ বিষাদ শেষে
নিঝুমের রাজত্ব কেবল, নিরবদ্য বাঁধন খুলে
ক্লান্ত প্রাণ ঊর্ধ্বে মেলে ধরে রক্তকরবীর যন্ত্রণা।

অথচ প্রকৃত মৃত্যু হয় চিবুকের অস্পষ্ট সাড়া
অথচ প্রকৃত মৃত্যু হয় চিবুকের অস্পষ্ট সাড়া

বিদেহী টগর জানে, কতটা উদ্দীপ্ত তাঁর অন্তর্শিখা
আর শিখা মাত্রই সঙ্গত ক্রোধ, রোমাঞ্চ প্রদর্শন
ভ্রমণের আরেক উষ্ণধারার নাম তবে লোহিতকণা।