খাশোগি সম্পর্কে কী বললেন তাঁর প্রেমিকা হাটিজে জেংগিস

জামাল খাশোগি এবং হাটিজে জেংগিস। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি’র জন্মদিন ছিল গতকাল শনিবার। বিশেষ এই দিনটিকে ঘিরে উৎসবের আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন তাঁর বাগদত্তা হাটিজে জেংগিস। দিনটি ঠিকই এল, কিন্তু কোনো উৎসব হলো না। ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে ঢোকেন হাটিজের প্রিয় মানুষটি। আর ফেরেননি। সেখানে তিনি খুন হন।

গতকাল নিউইয়র্ক টাইমসে জামাল খাসোগিকে নিয়ে এক আবেগঘন কলাম লিখেছেন হাটিজে জেংগিস। তাতে জানা যায়, গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে একটি সম্মেলনে পরিচয় হয় দুজনের। খাশোগির লেখার বিষয় সম্পর্কে আগে থেকে পরিচিত ছিলেন হাটিজে। তাই মধ্যপ্রাচ্য ও ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা আলাপ হয় তাঁদের। জামাল তাঁর জন্মভূমির সাম্প্রতিক রূপান্তর নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তবে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি।

ওই দিনের পর প্রায়ই কথা বলতেন তাঁরা। দেখা করতেন। খাসোগির ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করার সাহস মুগ্ধ করে হাটিজেকে। একসময় তাঁদের মধ্যে আবেগী একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা দুটি মানুষের ভাগ্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

হাটিজে তাঁর কলামে খাশোগি চরিত্রের মানবিক কিছু দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন খাশোগি, তবে হৃদয়ে সব সময় ধারণ করেছেন সৌদি আরবকে। অথচ নিজের এই দেশেই ঠাঁই ছিল না তাঁর। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সমালোচনা করায় দেশ ছাড়তে হয় তাঁকে। সালমানের ক্রোধের মুখে দুটি স্যুটকেস নিয়ে দেশান্তরী হন খাশোগি। তবে দেশপ্রেমিক খাশোগি প্রাণভয়ে দেশ ছাড়েননি। নিজের চিন্তাভাবনা ও মতামতগুলো নিয়ে আরও বেশি করে লেখার জন্যই চলে আসেন। যখন কষ্ট হতো তখন তিনি ভাবতেন তাঁর কারাবন্দী বন্ধুদের কথা। আর নিজেকে সান্ত্বনা দিতেন এই বলে যে তিনি তো অন্তত মুক্তভাবে লিখতে পারছেন।

হাটিজে জানান, খাসোগির সততা ও আন্তরিকতা মুগ্ধ করে তাঁকে। একে অপরকে যখন জানলেন হাটিজে অবাক হয়ে দেখলেন খাশোগি কেবল একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিপূর্ণ সাংবাদিক ও চিন্তাবিদই নন বরং একজন সংবেদনশীল মানুষ। যিনি নিজের দেশের জন্য এক তীব্র বেদনা নিয়ে জীবন পার করছেন। পরিবার, স্বজন, ধর্মীয় সংস্কৃতি ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে পালিয়ে থাকা খাসোগির জন্য একরকম বোঝা ছিল। সামান্য একটা ইচ্ছে ছিল খাশোগির। মদিনার রাস্তায় শঙ্কাহীনভাবে হেঁটে বেড়ানোর। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার। প্রাণখোলা হাসিতে মেতে ওঠার, যা হয়তো আর কখনই পূরণ হওয়ার নয়।

জীবনের সব দুঃখ–কষ্ট–আনন্দ ভাগ করে নিতেই ভালোবেসেছিলেন হাটিজেকে। বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। খাশগির স্বপ্ন ছিল, যেন একদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হবে না এই পৃথিবীতে তিনি একা। তাই বিয়েসংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র আনার জন্যই ২ অক্টোবর কনস্যুলেট ভবনে যান তিনি।

ওই কলামে হাটিজে লেখেন, ২ অক্টোবর চমৎকার একটি দিন ছিল। কনস্যুলেট ভবনে ঢোকার আগে সারা দিনের কর্মপরিকল্পনা করে নিয়েছিলেন তাঁরা। ভবনে ঢোকার আগমুহূর্তে খাশোগি হাটিজেকে বলে রাখেন তিনি ফিরে না এলে তুর্কি কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বিষয়টি জানাতে। এরপর হেঁটে হেঁটে ভবনের দরজা দিয়ে ঢুকে যান খাসোগি, সেই দরজা দিয়ে আর তিনি ফিরে আসেননি। আর ওই দিন খাশোগির সঙ্গে সঙ্গে যেন হাটিজের জীবনের সব আনন্দও হারিয়ে গেল।

গত ১২ দিনে (২ থেকে ১৩ অক্টোবর) হাটিজের জীবনের সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেছে শুধু এই ভাবনায়, খাশোগি কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে কেমন আছেন? এই ১২ দিনের প্রতিটি দিন হাটিজের ঘুম ভেঙেছে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায়।

হাটিজে শুনেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সেদিন ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের অভ্যন্তরে যা ঘটেছে, তা প্রকাশ করার প্রচেষ্টায় যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট সত্যিকারের চেষ্টা করেন, তবে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান হাটিজে।

হাটিজে জেংগিস মনে করেন, খাশোগিকে যদি সৌদি সরকার হত্যাই করে, তবে এই শেষ, এটা ভাববার কোনো অবকাশ নেই। নিঃসঙ্গ এই দেশপ্রেমিককে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সব শেষ হয়নি। জন্ম নেবে  খাশোগির চিন্তা হাজার হাজার খাশোগি। তাঁর বক্তব্য তুরস্ক থেকে সৌদি পর্যন্ত প্রতিফলিত হবে। কতজনের মুখের ভাষা রুখে দেবে সৌদি সরকার?