সালমান শাহ : যেখানে রুপালি জ্যোৎস্না ভিজিতেছে শরের ভিতর

সালমান শাহ সম্ভবত এমন একজন—যার জন্মের থেকে মৃত্যু অধিক আভিজাত্যের। সালমান শাহ’র মৃত্যু নিয়ে যদিও আমার কোন স্মৃতি নেই। যা আছে তা ভুলে যাওয়ার। পাঁচ বছর বয়স তখন আমার। মনে রাখাও যে একটা কাজ, সেটাই তখনও মনে রাখতে শিখিনি। তবে এটুকু মনে আছে মা খুব অসুস্থ ছিলেন। বাড়িতে ডাক্তার এসেছিল। আর মনে আছে সালমান শাহ’র মৃত্যু সংবাদে পাশের বাড়ির রিঙ্কুদি বিষ খেয়েছিলেন। এসবই হয়তো ভুলে যেতাম। তবে আজও রিঙ্কুদির সাথে দেখা হলে, কোন এক কারণে আমার দিকে বিব্রত চোখে তাকান। আমি সালমান শাহ’র মৃত্যু ভুলতে পারি না।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ট্রাজেডির নাম সালমান শাহ। আজ বাংলা চলচ্চিত্র যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার সাথে যদি শুধু সালমান শাহ নামটা যোগ করা যেত, বিশ্ব চলচ্চিত্রের মোড়ল হতে খুব বেশি কষ্ট করতে হতো না।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফল একটা সময় পার করেছে। তখন বাণিজ্যিক আর অফট্র্যাক ছবি, দুই-ই নির্মিত হয়েছে সমান্তরালভাবে। এ সময়ই সিনেমায় এক্সপেরিমেন্ট করার সাহস পেয়েছিল পরিচালকরা। অনেক রিমেক সিনেমা এ সময় হয়েছে।

 

কেয়ামত থেকে কেয়ামত
কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির পোস্টার। ছবিসূত্র : banlatribune.com

সালমান শাহ’র প্রথম ছবি সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত কেয়ামত থেকে কেয়ামত। এটাও হিন্দি ছবির রিমেক। এই প্রচলনটা নব্বইয়ের দশকেই শুরু। আর তার সাথে শুরু বাংলা সিনেমার এক নতুন অধ্যায়। এ অধ্যায়ের নাম সালমান শাহ। প্রথম ছবিতেই অগুনিত তরুণ-তরুণীর হার্টথ্রবে পরিণত হলেন সালমান। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে বাংলা সিনেমায় প্রচলিত অভিনয়ের ভাষা বদলে দিয়েছিলেন ক্যারিসম্যাটিক এই নায়ক। চার বছরে অভিনয় করেছেন ২৭টি ছবিতে। তার মধ্যে ১৪টি ছবিতে সালমান শাহ’র বিপরীতে অভিনয় করেছে শাবনূর। মূলত রোমান্টিক ড্রামায় প্রাণদানের জন্য মেইন ক্যারেক্টারদের মধ্যে ভিন্ন এক কেমিস্ট্রির দরকার আছে, তা আমাদের শিখেছে এই জুটি। মানুষের মধ্যে সালমান-শাবনূর নিয়ে যে ক্রেজ তৈরি হয়েছিল তা আর কখনও বাংলা সিনেমায় হয়নি। 

সালমান-শাবনুর জুটি
সালমান-শাবনুর জুটির খুনসুঁটিও ছিল দর্শকপ্রিয়। ছবি : ইন্টারনেট

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম ফ্যাশন আইকন তিনি। নিজেকে উপস্থাপনের ভিন্নতা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে তাকে সবসময় নতুন রেখেছে। এমনকি তার মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও সালমান শাহ সমান ভাবেই অনুকরণীয়। বাংলা সিনেমার দর্শক যেভাবে অভ্যস্ত হয়েছিল চিরায়ত মেলোড্রামায়, সালমান তাদের সেখান থেকে বের ক’রে আনেন। তার কাউবয় হ্যাট, গগলস, লং কোটে তার ডিটেকটিভ লুক, হুডি শার্ট, প্যাক ব্রাশ করা চুল, কানে দুল, ফেড জিন্স মাথার স্কার্ফ, তার ফ্যাশন সেন্স সবকিছু মিলিয়ে দর্শকরা কখনও না দেখা এক জোনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। দর্শক যতোটা দেখে তার সবটাই নতুন। তাদের চিন্তার গরীবিকে বারবার কটাক্ষ করেছে সালমান শাহ’র ব্যক্তিত্ব। তাই সত্তরের দশক থেকে বাংলা সিনেমায় চলে আসা ফ্যামিলি ড্রামা বা রোমান্টিক ড্রামার প্রচলিত কাহিনী নির্ভর ছবিতেও সালমান শাহ নিজেকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এখানে তিনি অন্যদের থেকে ভিন্ন।

চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী সালমান শাহ সম্পর্কে বলেন, ‘সিনেমার হিরোদের নানা স্টেরিওটাইপের মধ্যে সে ছিল অনেক স্বাভাবিক একজন অভিনেতা। তার সময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকা এমনকি এখনকার সময়ের থেকেও। শিক্ষাদীক্ষা বা জীবনযাপনের ছাপ মানুষের চলনবলন এমনকি তাকানোর মধ্যেও ফুটে ওঠে। মেইনস্ট্রিমের স্টার কারখানার মধ্যেও তাই সে আলাদাভাবে আলো ছড়াতো।’

ফ্যাশন আইকন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

সালমান শাহ মূলত সিনেমাপ্রেমীদের কাছে নিজস্ব একটা অবস্থান দাঁড় করিয়েছিলেন; আবার বলা যায় সালমান শাহ এমন এক আবহ যাকে ফোরকাস্ট করা যায় না। সালমান শাহকে আলাদাভাবে আপনাকে চিনে নিতেই হবে। সিনেমা জগতে তিনি যখন এক আইকন হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছেন, সে সময় তিনি নাটকেও অভিনয় করেছেন। এতোটাই ভার্সেটাইল ছিলেন তিনি। প্রায় ৮টি নাটকে অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে ‘নয়ন’ নাটকটি বাচচাস এর শ্রেষ্ঠ নাটকের পুরস্কার পেয়েছিলো। এই নাটকে সালমান একজন মাস্তানের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

সালমান শাহ
সালমান শাহ এক পৌরাণিক চরিত্র । ছবিসূত্র : ইন্টারনেট

সালমান শাহকে প্রথম টিভির পর্দায় দেখা যায় ১৯৮৫ বা ৮৬ সাল। তখন হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় ‘কথার কথা’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। এর কোন একটি পর্বে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামের একটি গানের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়াতে প্রথম আলোচিত হন। তখন অবশ্য তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। আরও কয়েক বছর পর অবশ্য তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় পাথর সময় নাটকে একটি ছোট চরিত্রে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন। অভিনয়ের ম্যাকানিজমে তিনি যে অপার পরিবর্তন পরবর্তীতে এনেছিলেন তার ছাপ কিন্তু প্রথম থেকেই পাওয়া গিয়েছিল।

ব্যক্তি জীবনে সালমান মাটির কাছাকাছি একটা মানুষ। এই প্রসঙ্গে মতি’র কথা এখানে বলা যায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এফডিসিতে পা রাখেন মতি। মতির বয়স ৩৮। মতি বলেন, ‘‘আমাকে সালমান শাহ খুব পছন্দ করতো। যখন তখন কাছে ডেকে নিতো। আমি গোসল করতাম কম। তিনি আমাকে জোর করে গোসল করিয়ে দিতেন। শরীর মুছিয়ে দিতেন। আমার প্রতি তার ছিল অসীম দরদ। শুটিং এর ফাঁকে ক্লান্ত হলে তিনি আমার পাশেই ঘুমিয়ে পড়তেন।

এফডিসি থেকে বের হলেই চার রাস্তার মোড়ের কর্নারে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। একবার জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তিন-চার দিন বাসা থেকে বের হতে পারিনি। এফডিসিও যাওয়া হয়নি। সালমান শাহর সঙ্গেও তার দেখা হয়নি। সালমান শাহ কারও কাছ থেকে জানতে পারলেন আমি জ্বরে আক্রান্ত। তিনি সেসময় ‘পিয়াসি’ ছবির শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তারপরেও রাতে আমার বাসায় সালমান হাজির। রাগ দেখালেন, কেন তাকে জানানো হয়নি বিষয়টি। কারণ তার কাছে আমি যখন যা চাইতাম তখন তাই দিত। আমি সালমান ভাইয়ের সঙ্গে ১০-১২টি সিনেমায় প্রোডাকশনে কাজ করেছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

আমি দেখতে মোটেও সুন্দর ছিলাম না। কাজের জন্য অপরিচ্ছন্নও থাকতে হতো। তারপরেও দেখা হলেই বুকে নিতেন সালমান ভাই। আমাকে অনেক আদর করতেন। গুলশানে যেখানে ওয়ান্ডারল্যান্ড ছিল তার পাশেই আমাকে বাড়ি করে দিতে চেয়ছিলেন। সিরিয়াস ভাবেই সালমান ভাই বলেছিলেন, ‘আনন্দ অশ্রু’ ছবিটি মুক্তি পেলেই তোকে বাড়ি করে দেবো। আনন্দ অশ্রু ছবির মুক্তি পাওয়ার আগেই তো তিনি চলে গেলেন। আমার আর ঢাকায় নিজের বাড়ি হয়নি, হবেও না।’’

সালমানের মৃত্যু নিয়ে আজও রয়ে গেছে রহস্য। ছবি: ইন্টারনেট

 

সালমান শাহ’র মৃত্যু বাংলা সিনেমা জগৎকে কয়েকশ’ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এক অপূরণীয় ক্ষতি। ‘আমি যেদিন থাকবো না সেদিন আপনারা বুঝবেন আমি কি ছিলাম। আমি সেদিন সত্যিই তোর শেষ কথাটি বুঝিনি’, সালমান শাহ’র এই কথাটা এতো প্রবলভাবে আমাদের দিকে ফিরে আসবে, কেউ হয়তো ভাবেনি। বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় ক’রে সালমান যে নিজস্বতার ছাপ রেখেছিলেন, সময়ের সাথে হয়তো অফট্র‍্যাক মুভিতেও তিনি প্রতিষ্ঠা পেতেন। হয়তো আজকের দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলো দর্শকের ভীড়ে উদযাপন করতো চলচ্চিত্র, হয়তো সিনেমায় এই দর্শকহীনতার মুখোমুখি কখনও বাংলা চলচ্চিত্রকে হতে হতো না। এমন অসংখ্য হয়তো নিয়ে সালমান শাহ বাংলা সিনেমার মিথ হয়ে রয়ে গেছেন। বাংলা সিনেমার পৌরাণিক এক চরিত্র। প্রথম সিনেমাতেই যিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগৎকে। লাখো তরুণী কোন এক অচিন কারণে প্রেমে পড়তে থাকল বিবাহিত সালমানের। আর যখন সালমান মারা গেলেন, ২৫ জনেরও বেশী তরুণীর আত্মহত্যা করার খবর এসেছিলো পত্রিকায়। মানুষের কতটা গভীরে বাস করতে পারলে কারো মৃত্যুতে সম্পূর্ন অপরিচিত একটা মানুষ মরতে পারে! তার মৃত্যুর পর রিয়াজ, ফেরদৌস, ওমর সানী, মান্না দর্শকদের হলমুখী করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যে দর্শক সালমান শাহ’র না থাকা বিষণ্ণতা বুকে নিয়ে আছে, তাকে ফেরাতে পারে কেবল সালমান শাহ। আর বাংলা চলচ্চিত্রের আগামী ১০০ বছরেও আরেকজন সালমান শাহ আসবে না, এ এক নির্বেদ সত্য।

 

তবে পরিবর্তনের চিরদূরপথ আবার চোখের সীমানায় চলে আসছে। বাংলা চলচ্চিত্র ফাঁপা বাণিজ্যিক সিনেমা থেকে সরে আসছে। আমরা একজন সালমান শাহ নাও পেতে পারি, তবে পুরো সিস্টেমটাকে সালমান শাহ বানিয়ে ফেলা খুব একটা কঠিন কিছু না।