বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের ১২৮তম তিরোধান দিবস

‘কে তোমার আর যাবে সাথে, কোথায় রবে হে ভাই বন্ধু… পরবে যেদিন কালের হাতে’- এই গানে ১৬ আক্টোবর মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী বাউল সম্রাট মরমী সাধক ফকির লালন সাঁই-এর ১২৮ তম তিরোধান (মৃত্যুবার্ষিকী) দিবসের অনুষ্ঠানমালা ও লালন মেলা। এ উপলক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির বারাম খানার আখড়া বাড়িতে বসতে শুরু করেছে সাধূর হাট। আখড়াবাড়ি পরিণত হবে সাধূ-গুরু-বাউলদের মিলন মেলা।

যদিও সোমবার (১৫ অক্টোবর) সকাল থেকেই দলে দলে সাধুরা আসতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যেই তারা শুরু করেছেন ক্ষুদ্র আসরে বাউলা গান। কেউ কেউ আবার গুরুর মুখে শুনছেন দেহতত্বের কথা, জানার চেষ্টা করছেন মানবজীবন সম্পর্কে। সব মিলিয়ে লালন আখড়াবাড়িতে উৎসব প্রায় জমে উঠেছে। এ দিন সকালে লালন আখড়াবাড়িতে দেখা যায় কাঙালিনী সুফিয়াকে। প্রায় ৬০ বছরের এই বাউল শিল্পী তার গানের সুরের মধ্য দিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন ক্ষুদ্র গানের আসরকে। তার এই গানের আসর ঘিরে বসে রয়েছে ভক্তরা।

ফকির নাদিম শাহ বলেন, ‘সাঁইজির গান গাওয়ার কোনো সময় হয় না। যেকোন সময় সাঁইজির গান গাওয়া যায়। এর জন্য আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন পড়ে না বাউল ভক্তদের। মূল বিষয় হলো সাঁইজির বাণী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং বাস্তবে কাজে লাগানো।’

আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আমাদের দিন বদলের অনুপ্রেরণা মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে বাউল সম্রাটের ১২৮তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানমালাকে সাজানো হয়েছে ৩ দিনব্যাপী। মূল উৎসব শুরু হওয়ার ৫/৬ দিন আগ থেকে আখড়ায় আসা বাউল সাধকরা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে গেয়ে চলেছে সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান। জমজমাট এখন লালন শাহের আখড়া বাড়ি। কুষ্টিয়া পরিণত হয়েছে উৎসবের শহরে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমির আয়োজনে মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩ দিনব্যাপী বাউল সম্রাট সাধক ফকির লালন শাহের ১২৮ তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান চলবে। আখড়া বাড়ীতে মঞ্চ ও লালন মেলার স্টল নির্মাণ ও মাজার ধোয়া মোছার কাজ শেষ করা হয়েছে । সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে থাকবে র‌্যাব ও সাদা পোষাকে গোয়েন্দা পুলিশ।

উল্লেখ্য, বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষ গুরুর দিক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আবির্ভাব ঘটে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানাজনের নানামত থাকলেও আজও অজানায় রয়ে গেছে তাঁর জন্ম রহস্য। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসংগতির কারনে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। যৌবনকালে পূণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমনে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।

তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে কালিগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার হয়ে মলম শাহ’র আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরী লাভ করেন। ভক্ত মলম শাহের দানকৃত ১৬ বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধন-ভোজনের জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরী করা হয়। সেই ঘরেই তাঁর সাধন-ভজন বসতো।

ছেঁউড়িয়ার আঁখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন তিনি। ফকির লালন সাঁই প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এই মরমী সাধক বাউল সম্রাট দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়।