সেনোরিতা, নিষিদ্ধ লোবান ও অন্যান্য । পার্থ অগাস্টিনের কবিতা

সেনোরিতা

এখনো অনাবাদী কুয়াশার কাছে কিছু প্রাক্তন স্মৃতি
জমা আছে।
গোলাপী শহরের
মৃত্যুমুখী রাস্তায়
যেসব অস্থির মিছিল;
তার সামনে রাখা আছে
প্রণয় সভ্যতার
সবচে’ বিরহী ট্যাংক…

কিছু দণ্ডিত কথার কাছে
তুমি হেরে গিয়ে
তলিয়ে আছো—জল—ইতিহাসে।
ভুল ভায়োলিনে ডুবে
এখনো আমি
উত্তাল ঢেউয়ের তুফান গুণি
শামুকের সাথে।

জানো?
ট্রমা কিংবা মদে, ঘৃণার বারুদে
এই খোলাবুকের পাঁজর
আর কিছুতেই জ্বলে না এখন।

এসব এলোমেলো সময়ের
মুখস্ত ফিরে আসা—
দেখতে দেখতে
আমি কবিতা লিখি।

জানোতো—
অতৃপ্ত মানুষের কাছে
কখনো তুষ্ট নয় জারজ সমাজ।

ভালো আছি, সেনোরিতা—
ফাগুনের প্রথম হাওয়ায়,
অনাগত সুরে
দুলিনা এখন আর
আগের মতোন—
নিশ্বাসে বই কেবল
তুমুল আর্তনাদ…!

নিষিদ্ধ লোবান

কফিনটাকে ঠোকরায় কিছু বেজন্মা ইঁদুর!

তোমরা যা-ই বলো—প্রেরণাযোগানো দুটি বিষাক্ত সাপ নিয়ে, আমিও খিলখিলিয়ে হাসছি; রক্ত-রক্ত খেলায় আমিও জড়াচ্ছি ঘাতক প্লাবন।

যতোবার দোল খায় মৃত্যুবীজ ততোবার খসে পড়ে জন্মকুণ্ডলী—

তবুও মনে করিয়ে দিই কলমের দায়িত্ব, চাবি ও চাবুকের ভ্রান্ত-কৌশল।

বিভ্রান্ত হবার কারণ দেখছি না, প্রিয়;

দু’টি অলিক প্রজাপতি বাজির তাসের মতো নীরব ভঙ্গিমায় শুয়ে আছে কবরের উপর—তোমাদের অপেক্ষায়;

…মৃত অনামিকায় দূর ভবিষ্যৎ চাপিয়ে, দায় ও দয়ার দাক্ষিণ্যে এবার আগামীর মশালটি জ্বালিয়ে এসো…

বেজন্মা ইঁদুরগুলো ঝলসে যায় আলোর তরবারিতে; আমাকে ঠোকর দেয় প্রেরণার সাপ।

প্রিয়,
নিষিদ্ধ লোবানে তুমিও বুক পুড়িয়ো…

মুহুরী নদী

নদীর ভেতরে শুয়ে আছে সতেরোটি গোলাপ লাশ!

গত বছর তারা তীর্থভ্রমণে গিয়েছিলো সমুদ্রে। প্রাণে-প্রাণ মেলাতে। ঝিনুকের মাংস ভেদে ঢুকে যাওয়া সঙ্গম দৃশ্য কতোটা নিষ্ঠুর, তারা দেখেছিলো। তারা দেখেছিলো কীভাবে গোপন একটি ঘাঁ ঘাপটি মেরে বসে হাঙরের মুখে হিংস্র নিঃশ্বাস নিয়ে। সমুদ্রের ভেতরে কীভাবে দাবানলে পুড়ে যায় অজস্র নিষ্পাপ ক্ষুদ্র প্রাণ…
অতঃপর সূর্যের ডানা কেটে কীভাবে পশ্চিমা আকাশ মেলে ধরে অন্ধকার।
আহা! সে কী নিখুঁত দৃশ্য…

এ দৃশ্য শেষে তারা ফেরে বাড়ীর পথে-ই

সরীসৃপের ন্যায় পিচ্ছিল সেতুতে পিছলে পড়ে চলন্ত চার-চাকা। ধুমড়ে-মুচড়ে টলে পড়ে মুহুরী নদীর গর্ভাগারে। ক্রমে ক্রমে রুদ্ধশ্বাস। মৃত্যুর সম্মুখে যেতে যেতে বলে:

হে নদী, তুমি যদি বৃদ্ধ হও শেষপ্রান্তে রবে ক্রমে ক্রমে, সতেরোটি গোলাপ লাশ।

দ্যা থিউরি অব্ লাইফ

একটি অমল বাগান তৈরির দায়িত্ব
দিয়েছিলাম এক বৃদ্ধ লোককে।

বাগান জুড়ে যেনো প্রতিদিন শস্যদানার
অঙ্কুরোদগম হয়;

যেন ঘুরে বেড়ায় জলফড়িঙ—
কাটা কস্পাসের মতো একই বৃত্তে লাট খায়
ফুলের সুবাসে—

চারু বাগান জুড়ে যেনো উড়ে উড়ে যায় অজস্র
কামনার তীর;
এফোঁড়-ওফোঁড় করে তরুণী হৃদপিণ্ড, দ্বিধা হয়
প্রেমের পারদ।

প্রাণের মিছিলে যে শাস্ত্র ভর করে—তার
জন্মকুষ্ঠি ভুলে,
বৃদ্ধকে বারণ করেছিলাম
পতঙ্গদের বিষ ছুড়ে না দিতে।

অতঃপর, দীর্ঘ বুনট শেষে ভরা শ্রাবণী পূর্ণিমায়-
বৃদ্ধ তার বুড়ো হাতের ভেলকি দেখালো—

আহা অমল বাগান! আহা প্রেম! আহা প্রাণের
দোলা!

গতির তৃতীয় সূত্র কপচে
বুড়ো লোক—
একটি কফিন বানিয়ে রাখলো।

মৃত্যু-মৃত্যু খেল

সে এক ধোঁয়াটে বোতল!
তার মধ্য দিয়ে
আমিও দেখছিলাম দুনিয়ার খেল।
কি এক অপূর্ব সময়ে,
ঈশ্বরও অালিঙ্গন খুলে দিলেন!

দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলাম কাঁকড়ার কুঁড়েঘর।

শাদা পায়রার পেছন
ঘুরঘুর আর ঘুরঘুর—
যাইনি উড়ে এক আলোকবর্ষ দূরে;
তবুও দিব্যি আনন্দে ছিলো মন।

হঠাৎ ভেঙে গেলো আয়নামহল…

মৃত্যু হতে লাফিয়ে উঠা;
অতঃপর জলন্ত অাগুনের ঝাঁজে প্রাণ-বিসর্জন।

বিদঘুটে রাত আর তার ঢং ঢং ধ্বনি;
তুমুল তুফানে ভাঙে চতুর্বলয়;

কাতর প্রার্থনা—প্রাণ ভিক্ষার;
ডুবে যায় শুক্লা-দ্বাদশীর রাত।
দিকে দিকে উড়ে যায় আয়ুর আঁচল;
মূল্য দেয়নি তার-মহামতি ঈশ্বর!

কি এক নগ্ন হাওয়ার মিছিলে,
অচ্ছুত লগ্ন পেরিয়ে,
শুষে খেলো বোতলের শেষ—আত্মার পরম সুধা…