মায়া সভ্যতার রহস্য কতখানি রহস্যময় ?

মায়া সভ্যতায় আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার যে বীজ বোপন করা হয়েছিল তা ছিল সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য  চরম বিস্ময়ের ব্যাপার। প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম “মায়া সভ্যতা” তাই সর্বদা আগ্রহের বিষয়বস্তু। রহস্যের ঘেরাটোপে রয়েছে এর অসংখ্য নিদর্শন।

মায়ানরা মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকায় বসবাসকারিদের স্বগোত্রীয়।  তারা আধুনিক মেক্সিকোর ইউকাটান, কুইন্টানা রু, কাম্পেচি, তাবাস্ক এবং চিয়াপাস আর দক্ষিণ দিকে গুয়েতেমালা, বেলাইজ, এলসালভেদর হয়ে হন্ডুরাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকাটি উত্তরের নিচুভূমি যা ইউকাটান পেনিনসুলা দ্বারা ঘিরে রয়েছে।

মায়া শব্দটি ইউকাটান শহর “মায়াপান” থেকে নেয়া হয়েছে। মায়াপান প্রাক-ক্লাসিক যুগের মায়ান রাজত্বের শেষ রাজধানী শহর। জাতিগত এবং  ভাষাগতভাবে তারা দক্ষিণের কিশে এবং উত্তরের ইউকেটেকদের সাথে সম্পর্কিত।

মায়া সভ্যতা একটি মেসোমেরিকান সভ্যতা যা হায়ারোগ্লিফিকস  লিখনপদ্ধতি জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং এটি প্রাক কলাম্বিয়ান আমেরিকান ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ লিখন পদ্ধতি তৈরি করেছে। মায়া সভ্যতা তার শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য,  গণিত, দিনপঞ্জি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মেক্সিকোর মিউসিউ ডি সিটিওর মায়া সভ্যতার গ্লিফস;    ছবিসূত্র : https://en.wikipedia.org

মায়া সভ্যতা ধাপে ধাপে যোগ করে মানব সভ্যতা বিবর্তনের এক একটা অংশ।

আর্কেয়িক সময়ে (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০) কৃষি এবং প্রাথমিক গ্রাম ব্যবস্থার উন্নয়ন দেখতে পাওয়া যায়। প্রিক্লাসিক (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে মায়া এলাকায় প্রথম জটিল এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এ সময়েই বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ পদ্ধতি উন্নতি লাভ করে। প্রথম মায়া শহর গড়ে উঠে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫০ হতে ৫০০ এর মাঝামাঝি সময়ে। এ সময়ে গড়ে উঠা শহরগুলোতে অনেক স্থাপত্যশিল্পের চিহ্ন পাওয়া যায়। তন্মধ্যে অনেক মন্দির রয়েছে যেখানে স্ট্যাকো ফেসেডের বিস্তারিত ব্যবহার দেখা যায়। লিখনপদ্ধতির গোড়াপত্তন হয় এই সময়েই। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে  হায়ারোগ্লিফিক্সের অনেক ব্যবহার দেখা যায়।
আর্কেইক যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০-২০০০) একদল শিকারী ভুট্টা, বীনস, অন্যান্য সবজি উৎপাদন শুরু করে। গৃহপালিত পশু বিশেষ করে কুকুর এবং টার্কি পালন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। এই সময়েই প্রথম গ্রাম ব্যবস্থা চালু হয়। বিভিন্ন দেব-দেবীদের উপাসনাও শুরু হয় এই সময়েই। এভাবেই খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ এই সময়ের মধ্যেই গ্রাম ব্যবস্থা তথা সামাজিকভাবে মানুষ বসবাস শুরু করে।

অ্যালমেগ বা প্রি-ক্লাসিক যুগ বা ফরমেটিভ যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-২০০),  মেসোমেরিকার সবচেয়ে পুরনো সংস্কৃতি। এসময়ে অ্যালমেক্সরা রাজত্ব করতো। অ্যালমেক্সরা মেক্সিকো উপসাগরের পাড় ধরে ইট ও পাথরের দালান তৈরি করে শহর গড়ে তোলে। আলমেক্সের বিখ্যাত নেতারা উচ্চমানের মূর্তি তৈরির আদেশ দিতেন। শামানিক ধর্মের প্রবর্তন এই সময়েই হয় বলে ধারণা করা হয়। প্রচুর সংখ্যক বিভিন্ন আকারের অ্যালমেক ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা করা হয় যে, সে-সময় দানবেরা বাস করতো। যদিও অ্যালমেক্সদের আদি অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি এবং পরবর্তীকালে তারা কোথায় হারিয়ে যায় সেটাও জানা যায়নি,   অ্যালমেক্সরা ভবিষ্যতের মেসোমেরিকা সভ্যতার গোড়াপত্তন করে।

জেপোটেক অধ্যায় (খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০- ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ), আধুনিক অক্সাকা এলাকার চারপাশে জেপোটিক সভ্যতা বিবর্তিত হয়। এটি বর্তমানে বিখ্যাত সাংস্কতিক কেন্দ্র, মন্টি আলবানা নামে পরিচিত। এখানেই গড়ে উঠেছিল জেপোটিক সভ্যতার  রাজধানী। জেপোটিকরা অ্যালমেক্সদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই সময়েই গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাল গণনার ক্যালেন্ডারের ব্যবহার শুরু হয় যা পরবর্তীকালে মায়া সভ্যতায় পরিপূর্ণতা লাভ করে।

টিওটিহিওয়াকান অধ্যায় (২০০-৯০০ খ্রিষ্টাব্দ), এই সময়ে ছোট একটি গ্রাম থেকে বিভিন্ন আকারের মেট্রোপলিস শহর গড়ে ওঠে। বিখ্যাত টিওটিহিওয়াকান শহর এই সময়েই গড়ে ওঠে। টিওটিহিওয়াকানদের সাথে কিউকিউলকবাট শহরের শত্রুতা ছিল। কিউকিউলকবাট আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান থেকে ধারণা করা হয় টিওটিহিওয়াকানরা একজন দেবীর উপাসনা করতো এবং তাঁর উপাসনার জন্য মন্দির ছিল। কুকুল্কান মায়ানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবী ছিল। অন্য অনেক শহরের মতো টিওটিহিওয়াকানও দক্ষিণ আমেরিকার ধ্বংসপ্রাপ্ত এক জনপ্রিয় শহর। ৯০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে এই শহর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বলে ধারণা করা হয়।

এল তাজিন পিরিয়ড (২৫০-৯০০ খ্রিষ্টাব্দ), মেসোমেরিকা এবং মায়া ইতিহাসে এই সময়কালকে  ক্লাসিক সময় বলা হয়। মেক্সিকো উপসাগরের বিখ্যাত সিটি কমপ্লেক্স ‘এল তাজিন’ নাম থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি মেসোমেরিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। সীমানা পেরিয়ে এই সময়েই সব বড় বড় শহর গড়ে ওঠে। শুধু মায়া সভ্যতাতেই হাজার শহর গড়ে উঠে। উল্ল্যেখযোগ্য ‘বল গেইম’ যা পরবর্তীতে ‘পক-আ টক’ নামে পরিচিত ছিল তা এই সময়েই আবিষ্কৃত হয়। প্রচুর পরিমাণে ‘বল কোর্ট’ এল তাজিন শহরের আশেপাশে আবিষ্কৃত হয় যা আর কোথাও পাওয়া যায়নি। এল তাজিনের বাসিন্দাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না; কারণ পঞ্চাশটারও বেশি উপজাতির দল এই শহরকে প্রতিনিধিত্ব করতো। মায়া এবং টোটোনাকদের প্রতিনিধিত্বও তারা করতো।

মায়ানদের বল গেইম বা ‘পক-আ টক’ প্রতীকী দৃশ্য ।

মায়া সভ্যতা ক্লাসিক পিরিয়ডে অবিশ্বাস্য সাংস্কৃতিক উন্নতি লাভ করে। মায়ানরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে জীবন চক্রাকারে আবর্তিত হয়। কোনকিছুই জন্ম নেয় না বা কোনকিছুর মৃত্যু হয় না। এই বিশ্বাস তাদের দেব-দেবীর উপাসনা ও সুশৃঙ্খল জীবনের উৎসাহ দেয়। তাদের সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের স্থাপত্যবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিরবিজ্ঞ্যানের কল্পনাশক্তি উন্নত করে। ভূপৃষ্ঠের নীচে অন্ধকার জগত শী-বাল-বা র রাজত্ব। যেখান থেকে বের হয় “গ্রেট ট্রি অব লাইফ”। পৃথিবীর মধ্য দিয়ে এই গাছ স্বর্গে উত্থিত হয়। স্বর্গ থামঞ্চান বা কুয়াশাছন্ন আকাশে পৌঁছাতে তেরটি ধাপ পার হতে হয়-

তাদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী পাতাল্পুরী শী-বাল-বানরা মানুষের আত্মাকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করে। সেখান থেকে বাঁচতে পারলে একজন মানুষের পক্ষে নয়টি জাগতিক ধাপ পার হয়ে স্বর্গে পৌঁছাতে পারে। স্বর্গ তামোঞ্চান পৌঁছানোর পর সীমাহীন সুখে বসবাস নিশ্চিত। উল্লেখ্য স্বর্গ কিন্তু আকাশে নয় বরং এই ধরিত্রীতেই এর অবস্থান। তেরটি ধাপ পার হওয়ার পর একজন মানুষ বাতাসে নয় বরং একটি আধ্যাত্মিক পাহাড়ের চূড়ায় তার আবাস হয়। তাদের সাইক্লিক বা আবর্তিত ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্যই মায়ানরা আত্মাহুতিতে কোন পাপ বা ভুল দেখতে পায় না। যেসব মানুষকে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়; মনে করা হয় তারা মরে না বরং বেঁচে থাকে। মায়ানদের এই কসমোলজিক্যাল বিশ্বাস মায়া সভ্যতা এবং তাদের ধর্মীয় রীতিনীতিতে অনেক প্রভাব ফেলে।

রহস্যময় মায়ানরা ১৮৪০ সালের এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত নিজেদের রহস্যের ঘেরায় রেখে দিয়েছিল। ১৮৪০ এ জন লোয়েড স্টিফেন এবং ফ্রেডারিক কেথারউডের মায়া সভ্যতা আবিষ্কারের পর মানুষের কল্পনার ইতি ঘটে। মায়ানদের সংস্কৃতির রহস্য হালকা হয়ে আসে। মায়ানরা বিলুপ্তু হয় নাই। যারা চিচেন ইতজা, বোনামপাক, উক্সমাল এবং আলতুন হার মত বিখ্যাত শহরগুলো তৈরি করেছিল তাদের উত্তরসূরীরা এখনো একই জায়গায় পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে। তারা এখনো হাজার বছরের ঐতিহ্য পালন করে চলেছে। কখনো কখনো কিছুটা আধুনিকভাবে।