ব্যাকপ্যাক টুর: আলীর গুহা

[su_heading size=”19″]ব্যাকপ্যাক টুর, আলীর গুহা। আমরা গিয়েছিলাম আমাদের ফ্রেন্ডস গ্রুপ “escape artist” এর ২২ জন। যেহেতু  ব্যাকপ্যাক টুর তাই অনুরোধ ছিল ব্যাগ হালকা করার। সাথে তাবু বহনের ঝামেলা তো আছেই। ঢাকা থেকে আলিকদমের বাস আছে সরাসরি। হানিফ এবং শ্যামলী। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড  থেকে  ৯.৩০ এ আমরা সবাই রওনা হই আলীকদমের উদ্দেশ্যে শ্যামলী গাড়িতে। ভাড়া জনপ্রতি ৮৫০। [/su_heading]
সকাল ৬.৩০ এ আমরা নামি আলীকদম। স্থানীয় হোটেলে  নাস্তা সারি। আমাদের প্রথম গন্তব্য আলীর গুহা। আলীর গুহা যেতে হয় স্থানীয় টমটম অটোরিক্সায়। আলীর গুহার কথা বলতেই নামিয়ে দেয় তৈন খালের (মাতামুহুরি নদীর শাখা) পাশে। খেয়া পার , জনপ্রতি ২০ টাকা। এরপর কিছুটা পাহাড়ি পথ এগুতেই ঝিরিপথ শুরু। ঝিরিগুলো  অসম্ভব সুন্দর, দুপাশে পাহাড় এবং কিছু জায়গা এমন যে বেশ চেপা। সুড়ঙ্গ মোট ২ টি। একটাতে রেলিংযুক্ত খাড়া পাহাড়ে  উঠে সুড়ঙ্গে যেতে হয়। বাকীটা ইতিহাস। প্রথম সুড়ঙ্গে আমরা সবাই নিরাপদে ঢুকি। আমাদের সাথে কয়েকটা মশাল ছিল, সাথে প্রত্যেকের কাছে টর্চ ছিল।
আসি দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের কথায়। অতি সাহস না থাকলে না উঠাই ভালো।  এখানে রেলিং নেই। সমান্তরাল দুপাশের খাড়া  পাহাড়ের পিচ্ছিল খাঁজ বেয়ে কিছুটা উঠলে সামান্য দড়ি। সেটা বেয়ে কিছুটা উপরে উঠলে গাছের শিকড় বেয়ে পৌঁছাতে হয়। একবার পা ফসকালেই যমের দুয়ারে যাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। আমরা কয়েকজন সাহস নিয়ে উঠে গেলাম। বাকিরা নিচে রইল। এই গুহাটা বেশ বড়। ঢুকতে হয়  বসে বসে, পরে মাথা সোজা করে বের হওয়া যায়।
এইবার নামার পালা অন্য মুখ দিয়ে। সেটাও ইতিহাস। প্রথমে দড়ি বেয়ে নামতে হয় কিছুপথ। এরপর আবার সমান্তরাল দুই পাহাড়ের খাঁজে পা রেখে চারহাত পা ব্যবহার করতে হয়। বেশ নিচে খাদ, পড়লেই আহত। তবুও সবাই অনেক সময় নিয়ে নিরাপদেই পার হই। আলীর সুড়ঙ্গ দেখতে সময় লাগে ২.৩০-৩ ঘন্টা।
এরপর লাঞ্চ সারি সবাই।
সেদিন রাতেই ক্যাম্প করবো মারায়ন তং। এর জন্য যেতে হয় আবাসিক অটো দিয়ে। স্থানীয় বাজার থেকে রাতের খাওয়ার জন্য চাল, ডাল, মুরগির মাংস প্রত্যেকের জন্য ২ লিটার পানি এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে। বড় ডেকচিও ভাড়া করা হয়। এখানে সবচে বেশী জরুরী হলো খাবার পানি। ওখানে ঝরনা নেই, প্রাকৃতিক কাজ সারতে হবে ঘাসের জঙ্গলে। সুতরাং পানির কথা সবার মাথায় রাখতে হবে।
মারায়ন তং পাহার এর উচ্চতা ১৬৫০ ফিট। প্রতি বছর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মেলা হয় এই পাহাড়ে। কিছুটা খাড়া পথ ইট বাঁধানো। এরপর টানা খাড়া। এই চূড়ায় পৌঁছাতে প্রায় ২.৩০ মিনিট সময় লাগে। বেশ কষ্ট সাপেক্ষ ট্র্যাক।
তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬.৩০ বেজে গেছে। চারদিকে অপার্থিব পরিবেশ। আমরা দ্রুত আমাদের ক্যাম্প ফেলতে থাকি। এরপর চাঁদ উঠে যায়।  চাঁদের আলোয় পরিবেশ অপার্থিব লাগছিল। একদিকে রান্নার আয়োজন চলছিল। আমরা বেশ কিছু আতশবাজি এবং ফানুস নিয়ে গিয়েছিলাম। কয়েকটা আতশবাজি ফুটাতেই কয়েকজন এসে না করে। কারণ সাউন্ড শোনে নাকি নিচের সেনাবাহিনী আসতে পারে। আর ফানুস যদি আগুনসহ পাহাড়ে পরে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে। তাই এসব না নিয়ে যাওয়াই ভালো। এরপর আমরা ফায়ারক্যাম্প করি। গোল হয়ে বসে চাঁদের আলোয় গিটারের টুংটানের সাথে সবার গানের সুর ছড়িয়ে পরে পাহাড়ে। রাত ২ টার দিকে আমরা ঘুমাতে যায়। খোলা আবহাওয়ার কারণে বেশ শীত ছিল। ঘুমাতে কষ্ট হয় সবার। এখানকার প্রধান আকর্ষণ মেঘের ভেলা। দেখতে হবে সূর্যোদয়ের আগে।
৫ টার আগেই উঠে পরি এবং যা দেখি সেটা আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ দৃশ্য। পাহাড়ের চারপাশে মেঘের ভেলা। যেন এক স্বর্গপুরী। বাংলাদেশে এটাই একমাত্র পাহাড় যার এমন ভিউ। কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠে যায়। আমরা দ্রুত ক্যাম্প গোছাতে থাকি। যেতে হবে দামতুয়া।
মারায়ন তং থেকে নামতে আমার সময় লেগেছে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। গ্রুপের বাকীদের কিছুটা সময় বেশী লেগেছে একজনের অসুস্থতার জন্য বেশ টাইম চলে যায়। নাশতা সেরে আবাসিক থেকে দামতুয়ার দিকে যেতে হয় মোটরবাইকে। তবে আমরা লোকাল এক ভাইয়ের সহায়তায় একটা ট্রাক (ডাম্পার) ভাড়া করি। ১৭ কিলোমিটার রাস্তা। দেশের সবচেয়ে উঁচু হাইওয়ে আলীকদম থানচি সড়ক। নয়নাভিরাম সব পাহাড় দুইপাশে আলীকদম-থানচি রোড। ১১ কিলোমিটার গিয়ে আগে আর্মি ক্যাম্পে অনুমতি নিতে হয়। সকাল ১০ টার মধ্যে।
সবার ভোটার আইডির ফটোকপি সাথে রাখতে হবে। নাহলে আটকাবে। আমাদের সব ওকে ছিল। একটু লেটের কারণে অনেক অনুরোধে ছাড়া পায়। বিকেল ৫ টার আগেই আবার চেকিং দিতে হবে। আমরা বাকি পথটা দ্রুত পার হয়ে আদুপাড়া আসি। এখান থেকেই আমাদের ট্রেক শুরু। আমাদের ব্যাগ রেখে প্রয়োজনীয়  কিছু জিনিস নিয়ে যাত্রা শুরু করি। তখন বেলা চড়ে গেছে। প্রচন্ড রোদে সবার অবস্থা খারাপ। এমনিতেই কিছুটা দেরী হয়েছে। কীভাবে যে আবার ৫ টার আগে ফিরবো।  এজন্যই ১০টার পর আর্মি অনুমতি দেয় না। দামতুয়া পৌছাতে আমাদের ৩ ঘন্টার বেশী সময় লাগে। অনেক উঁচুনিচু পথ,আর বেশ কিছু ঝর্ণা। কোথাও তেমন বেশী অপেক্ষা করিনি, থেমেছিলাম ব্যাং ঝর্ণায়। দেখার মত একটা ঝর্ণা। ঝিরঝির করে ৩০ ডিগ্রী ধাপে ধাপে পানি ঝরছে বিশাল তার আয়তন। এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেই সামনে এগোতে থাকি। এরপর দেখা পাই দামতুয়ার।কালো  খাড়া দুই পাহাড় থেকে প্রবল বেগে পানি ঝরছে। মনোরম এক দৃশ্য। অপেক্ষা না করে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। দাপাদাপি বেশি সময় সম্ভব হয়নি। খুব দ্রুত আবার ফিরতে হবে। ইচ্ছে না থাকলেও হাঁটা ধরলাম আবার। আবারো ৩+ ঘন্টা ট্রেক করে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে আদুপাড়া পৌঁছায়। এরপর ঢাকার পথে রওনা।
যা মনে রাখতে হবে:
-নরমাল স্ন্যাকস,শক্তিশালী,বাদাম,চকলেট,খেজুর।
-ফাস্ট এইড,প্রয়োজনীয় ওষুধ।
-বোতল এবং প্লাস্টিক সামগ্রী যত্রতত্র না ফেলা।