পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট লড়াই: অ্যাংলো-জানজিবার যুদ্ধ

এংলো-জানজিবার যুদ্ধকে বলা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে কম সময় ধরে চলা যুদ্ধ। ধরুন, আপনি একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে বসলেন। আর হাফ টাইমের আগেই গোটা একটা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও এটা সত্য। ১৮৯৬ সালে হওয়া অ্যাংলো-জানজিবার যুদ্ধ চলেছিল মাত্র ৩৮ মিনিট। সব যুদ্ধই নিঃসন্দেহে বেদনার। কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে জানজিবারের এ যুদ্ধের সঙ্গে মিশে রয়েছে খানিকটা হাস্যরসও। এ যুদ্ধে জানজিবারের সুলতান ব্রিটিশদের কাছে পরাজয় স্বীকার করেন। প্রসঙ্গত জানজিবার হলো আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তানজানিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।

Zanzibar Palace in the late 1800’s

১৮৯৬ সালে বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে ব্যস্ত ব্রিটিশরা। আফ্রিকা মহাদেশের অনেকটা অংশই তখন ইংল্যান্ডের দখলে। আফ্রিকার সুলতান শাসিত একটি ক্ষুদ্র দেশ জানজিবারও ব্রিটিশদের হাতে পরাধীন। তবে শাসন ক্ষমতা তখনও  সুলতানের হাতেই ছিল।

১৮৮৬ সালে জানজিবারের সুলতান হামাদ বিন থুয়াইনি-র সঙ্গে ব্রিটিশদের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী জানজিবারের সুলতান নির্বাচন করতে গেলে ব্রিটিশদের অনুমতি নিতে হবে। ১৮৯৬ সালে মৃত্যু হয় ব্রিটিশদের পছন্দের সুলতান হামাদ বিনের। ব্রিটিশ শাসক পরবর্তী সুলতান নির্বাচন করেই রেখেছিল। কিন্তু সুলতান খালিদ বিন বারঘাস ব্রিটিশদের উপেক্ষা করে সুলতানের তখতে বসে যান।

[su_divider top=”no”]১৮৯৬ সালের ২৭ ই আগস্ট সকাল ৯ টা ২ মিনিটে যুদ্ধ শুরু হয় এবং ৯ টা ৪০ মিনিটে তা শেষও হয়ে যায়।[su_divider top=”no”]

The sultan’s palace in Zanzibar, following its destruction during the Anglo-Zanzibar War in 1896.

তাকে ব্রিটিশদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য বেধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হয় পূর্ব আফ্রিকা সময় (ইএটি) অনুসারে ২৭ আগস্ট ৯.০০ টায়। অপরদিকে ব্রিটিশরা হার্বার এলাকায় তিনটি ক্রুজিয়ার, দুটি গানবোট, ১৫০ জন মেরিন সেনা ও নাবিক, এবং ৯০০ জন জাঞ্জিবার বাসীকে একত্র করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। যেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল হ্যারি রাউসন এবং জাঞ্জিবার সেনাবাহিনী থেকে জাঞ্জিবারদের নেতৃত্বে ছিলেন বিগ্রেডিয়ার-জেনারেল লয়েড ম্যাথিউস (যিনি জাঞ্জিবারের প্রথম মন্ত্রী ছিলেন)।

The Glasgow, a wooden sailing yacht that was no match for superior British Navy ships. Pictured in 1890.

অপরদিকে সুলতানের পক্ষে ২,৮০০ জাঞ্জিবার যুদ্ধা (যারা অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ জনগন) প্রাসাদ রক্ষায় যোগ দিয়েছিল। এদের নেতৃত্বে ছিল সুলতান খালেদের বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যরা। এছাড়াও সুলতানের কয়েকশ দাস, দাসীও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সুলতান বাহিনী কিছু আর্টিলারি কামান ও কিছু ম্যাশিনগান নিয়ে প্রাসাদের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনী ৯.০২ মিনিটে প্রাসাদ লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করে ও কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রাসাদে আগুন ধরে যায়। এদিকে ব্রিটিশদের আর একটি ছোট দল সুলতান বাহিনীর একটি ইয়ট ও দুটি যুদ্ধের ছোট নৌকা ডুবিয়ে দেয়। ব্রিটিশ বাহিনী যখন প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছিল তখন সুলতান বাহিনী বিচ্ছিন্ন ভাবে তাদের উপর গুলিবর্ষণ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে টিকতে পারেনি। ৯.৪০ মিনিটে ব্রিটিশরা প্রাসাদে ঢুকে পতাকা নামিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেয়।

HMS St George and HMS Philomel.

ব্রিটিশরা সুলতান খালিদ বিন বারঘাস-এর প্রসাদ ধ্বংস করে। মাত্র ৩৮ মিনিটে যুদ্ধে সুলতান খালিদের ৫০০ লোক আহত অথবা নিহত হয় অপরদিকে ব্রিটিশদের মাত্র একজন নাবিক আহত হয়। ব্রিটিশরা যুদ্ধের প্রায় পরপরই সুলতান হামাদকে ক্ষমতায় বসায়। এরপর থেকে জাঞ্জিবার এক নতুন যুগে প্রবেশ করে যেখানে ব্রিটিশদের প্রভাব সবচেয়ে বেশী ছিল।